ইসলামের বাস্তব কাহিনী - আবুন-নুর মুহাম্মদ বশীর (রহ.)

📚ইসলামের বাস্তব কাহিনী ✍🏻আবুন-নুর মুহাম্মদ বশীর

কাহিনী নং-১
হযরত ইমাম আযম (রাদিআল্লাহু আনহু) এর সাথে এক নাস্তিক পন্ডিতের বিতর্ক--
একবার আল্লাহর অস্তিত্বে অস্বীকারকারী এক নাস্তিকের সাথে আমাদের ইমাম হযরত আবু হানিফা (রাদিআল্লাহু আনহু) এর মুনাজেরা হয়েছিল। মুনাজেরার বিষয় ছিল- পৃথিবীর কোন সৃষ্টিকর্তা আছে কিনা। এতবড় ইমামের সাথে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মুনাজেরা দেখার জন্য শত্রু-মিত্র সবাই যথা সময়ে মুনাজেরার স্থানে সমবেত হয়ে গেল। নাস্তিক লোকটিও যথাসময়ে পৌঁছে গেল। কিন্তু হযরত ইমাম আযম নির্ধারিত সময়ের অনেক দেরীতে সমাবেশে তশরীফ আনলেন। নাস্তিক পণ্ডিত ব্যক্তিটি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এত দেরী করলেন কেন? তিনি বললেন, জংগল দিয়ে আসার সময় এক অদ্ভুত ঘটনা চোখে পড়লো, সেটা দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে ওখানে থমকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঘটনাটি হলো, নদীর কিনারে একটি বৃক্ষ ছিল। দেখতে দেখতে সেই বৃক্ষ নিজেই কেটে পড়ে গেল, এরপর নিজেই তক্তায় পরিণত হলো, অতঃপর সেই তক্তাগুলো নিজেরাই একটি নৌকা হয়ে গেল এবং সেই নৌকা নিজে নদীতে নেমে গেল এবং নিজেই নদীর এপাড় থেকে ওপাড়ে যাত্রী আনা নেয়া করতে লাগলো এবং নিজেই প্রত্যেক যাত্রী থেকে ভাড়া আদায় করতে ছিল। এ দৃশ্যটি দেখতে গিয়ে আমার দেরী হয়ে গেল। নাস্তিক পণ্ডিত এটা শুনে অট্টহাসি দিল এবং বললো, আপনার মত একজন বুজুর্গ ইমামের পক্ষে এ রকম জঘন্য মিথ্যা বলা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। এ রকম কি নিজে নিজে কিছু হতে পারে? কোন কারিগর না থাকলে, এ রকম কাজ কিছুতেই হতে পারে না।

হযরত ইমাম আযম বললেন, এটাতো কোন কাজই না। আপনার মতে তো এর থেকে অনেক বড় বড় কাজ এমনিতে হয়। এ পৃথিবী, এ আসমান, এ চাঁদ, সূর্য, তারকারাজি, বাগান সমূহ, রং বেরং এর নানা রকম ফুল, সুমিষ্ট ফল, এ পাহাড় পর্বত, জীব জন্তু, মানব দানব সব কিছু কোন সৃষ্টি কর্তা ব্যতীত এমনিতে হয়ে গেছে। যদি একটি নৌকা কোন কারিগর ছাড়া এমনিতে তৈরী হয়ে যাওয়াটা মিথ্যা হয়, তাহলে সমস্ত পৃথিবীটা সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত নিজে নিজেই তৈরী হয়ে যাওয়াটা ডাহা মিথ্যা ছাড়া আর কি হতে পারে?

নাস্তিক পণ্ডিত তাঁর এ বক্তব্য শুনে বিমোহিত হয়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বীয় ভ্রান্ত ধারণা ত্যাগ করে মুসলমান হয়ে গেল। (তাফসীরে কবীর ২২১ পৃঃ ১ম জিলদ)

সবক: এ বিশ্বের নিশ্চয়ই একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, যার নাম ‘আল্লাহ’। আল্লাহর অস্তিত্বের অস্বীকার যুক্তিরও বিপরীত।

কাহিনী নং-২
হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রাদিআল্লাহু আনহু) ও এক নাস্তিক নাবিক--
এক নাস্তিক নাবিকের সাথে হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রাদিআল্লাহু আনহু) এর বিতর্ক হয়েছিল। সে নাবিক বলতো যে আল্লাহ বলতে কিছু নেই (মাজাল্লা)! হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রাদিআল্লাহু আনহু) ওকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনিতো জাহাজ চালক, সমুদ্রে কি কখনো তুফানের সম্মুখীন হয়েছিলেন? 
সে বললো, হ্যাঁ, আমার স্পষ্ট স্মরণ আছে যে একবার আমার জাহাজ সমুদ্রের ভয়ানক তুফানে পতিত হয়েছিল। 
হযরত জাফর ছাদেক জিজ্ঞেস করলেন, – এরপর কি হয়েছিল? 
সে বললো, আমার জাহাজ ডুবে গিয়েছিল এবং জাহাজের সমস্ত যাত্রী ডুবে মারা গিয়েছিল। 
তিনি (রাদিআল্লাহ আনহু) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কিভাবে বেঁচে গেলেন? 
সে বললো, আমার হাতের কাছে জাহাজের একটি তক্তা ভেসে এসেছিল। আমি সেটার সাহায্যে সাঁতরিয়ে কূলের প্রায় কাছাকাছি এসে গিয়েছিলাম। কিন্তু পানির স্রোতে সেই তক্তাটা হাতছাড়া হয়ে যায়। তখন নিজেই চেষ্টা করতে লাগলাম, হাত পা নড়াছড়া করে কোন মতে কিনারে এসে পৌঁছলাম। 

হযরত জাফর ছাদেক ফরমালেন, এবার আমার কথা শুনেনঃ
যখন আপনি জাহাজে ছিলেন, তখন আপনার জাহাজের উপর উপর এ বিশ্বাস ও আস্থা ছিল যে, এ জাহাজ আপনাকে কূলে পৌঁছাবে। যখন সেটা ডুবে গেল তখন আপনার আস্থা ও ভরসা তক্তার উপর ছিল, যা হঠৎ আপনার হাতে লেগেছিল। কিন্তু যখন সেটাও আপনার হাতছাড়া হয়ে গেল, তখন সেই অসহায় অবস্থায় আপনার কি এ রকম আশাও ছিল যে, কেউ বাঁচাতে চাইলে আমি বাঁচতে পারি? 
সে বললো এ আশাতো নিশ্চয় ছিল। 
হযরত জাফর ছাদেক ফরমালেন, কার কাছে এ আশা ছিল? কে বাঁচাতে পারে? 
এ প্রশ্নে সেই নাস্তিক নিশ্চুপ হয়ে গেল। 
তিনি ফরমালেন, ভালমতে স্মরণ রাখুন, সেই অসহায় অবস্থায় আপনি যে সত্ত্বার কাছে আশাবাদী ছিলেন, সেই হলো খোদা, সেই তোমাকে বাঁচিয়েছে। 
নাবিক এ কথা শুনে মোহমুক্ত হলো এবং ইসলাম গ্রহণ করলো। (তফসীরে কবীর ২২১ পৃঃ ১ জিঃ)

সবক: খোদা একজন নিশ্চয় আছে। বিপদের সময় অনায়াসে খোদার দিকে খেয়াল যায়। খোদার অস্তিত্বের স্বীকার স্বভাবগত বিষয়।

কাহিনী নং-৩
এক বুদ্ধিমতী বৃদ্ধা—
এক মাওলানা এক বৃদ্ধাকে ছরকায় সূতা কাটতে দেখে বললেন, বুড়ি, সারা জীবন কি শুধু ছরকা ঘুরাতে রইলে, নাকি খোদাকেও জানার জন্য কিছু করলে? 
বৃদ্ধা উত্তর দিল, বেটা, এ ছরকার মধ্যে আমি খোদাকে জানতে পেরেছি। 
মাওলানা সাহেব বললেন, কি আশ্চর্য! তাহলে বলেন দেখি, আল্লাহ মওজুদ আছে কিনা? 
বুড়ি বললো, প্রতিটি মুহুর্তে, রাতদিন সব সময় আল্লাহ মওজুদ আছেন। 
মাওলানা সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, এটা কিভাবে? 
সে বললো, এভাবে, যেমন যতক্ষন পর্যন্ত আমি এ ছরকাকে চালাতে থাকি, ততক্ষণ এটা চলতে থাকে এবং যখন আমি এটাকে ছেড়ে দি, তখন এটা সে অবস্থায় থেমে যায়। তাই যদি এ ছোট ছরকায় সব সময় চালকের প্রয়োজন হয়, তাহলে জমীন, আসমান, চাঁদ, সূর্যের মত বিশাল ছরকাগুলোর চালকের প্রয়োজন কিভাবে না হতে পারে। অতএব যেভাবে আমার কাঠের ছরকার একজন চালকের প্রয়োজন, সে রকম আসমান-জমীনের মত বিশাল ছরকারও চালকের প্রয়োজন। যতক্ষণ পর্যন্ত সে চালাতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ সব ছরকা চলতে থাকবে এবং যখন যে ছেড়ে দেবে, তখন থেমে যাবে। কিন্তু আমি কোন সময় জমীন-আসমান, চাঁদ, সূর্যকে থেমে থাকতে দেখিনি। এতে প্রমাণিত হয় যে, এগুলোর চালক সব সময় মওজুদ আছেন। 
মাওলানা সাহেব পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন আচ্ছা বলুন দেখি, আসমান জমীনের চালক একজন, কি দু'জন? 
বুড়ি জবাব দিল, একজন এবং এর প্রমাণও আমার এ ছরকা।
কেননা, যখন আমি এ ছরকাকে আমার মর্জি মুতাবেক যেদিকে চালনা করি, তখন এ ছরকা আমারই মর্জিমত সেদিকে চলে। যদি অন্য আর একজন চালক হতো, তাহলে সে হয়তো আমার সাহায্যকারী হয়ে আমার মর্জি মুতাবিক চালাতো। তখন ছরকার গতি বৃদ্ধি পেয়ে স্বাভাবিক গতির মধ্যে তারতম্য সৃষ্টি হয়ে উৎপাদনে ব্যাঘাত হতো আর যদি সে আমার মর্জির বিপরিত হত এবং আমার চালনার উল্টো দিকে চালাতো, তাহলে এ ছরকা হয়তো থেমে যেত অথবা ভেঙ্গে যেত। কিন্তু এ রকম হয়নি। কেননা আমি ছাড়া অন্য কেউ এটা চালায় নাই। অনুরূপ আসমান-জমীনের যদি দ্বিতীয় আর একজন চালক হতো, তাহলে নিশ্চয় আসমানী ছরকার গতি বৃদ্ধি পেয়ে রাত দিনের গতিবিধির মধ্যে তারতম্য এসে যেতো বা থেমে যেত বা ভেঙ্গে যেত। যখন এরকম হয়নি, তাহলে নিশ্চয়ই মনে করতে হবে আসমান জমীনের ছরকা চালক একজনই। (সীরাতুছছালেহীন ৩পৃঃ)।

সবক: দুনিয়ার প্রতিটি জিনিস স্বীয় সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও একত্বের সাক্ষী। কিন্তু এটা উপলদ্ধি করার জন্য সুষ্ঠু জ্ঞানের প্রয়োজন।

দ্বিতীয় অধ্যায়

ছৈয়্যেদুল আম্বিয়া হুযুর আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মুস্তাফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)

কাহিনী নং-৪
হযরত জিব্রাইল আমীন ও এক নুরানী তারকা—
একবার হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) হযরত জিব্রাইল আমীনকে জিজ্ঞেস করলেন, হে জিব্রাইল তোমার বয়স কত? 
হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম আরয করলেন, আমার সঠিক জানা নেই, তবে এতটুকু জানি যে চতুর্থ হেজাবে এক নুরানী তারকা সত্তর হাজার বছর পর পর চমকাতো। আমি সেটাকে বাহাত্তর হাজার বার চমকাতে দেখেছি। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এটা শুনে ফরমালেন,– “আমার প্রতিপালকের ইজ্জতের কসম! আমিই সেই নুরানী তারকা”। (রুহুল বয়ান ৯৪৭ পৃঃ ১ম জিলদ)।

>সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) সৃষ্টি কুলের সবের আগে সৃষ্টি। হয়েছেন এবং তাঁর পবিত্র নূর ঐ সময়ও ছিল যখন না ছিল কোন ফিরিশতা, কোন মানুষ, না ছিল জমীন আসমান বা অন্য কোন বস্তু।

কাহিনী নং- ৫
ইয়ামনের বাদশাহ—
কিতাবুল মুসততরফ, হুজ্জাতুল্লাহে আলাল আলামীন ও তারিখে ইবনে আসাকেরে বর্ণিত আছে যে, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পৃথিবীতে আবির্ভাবের এক হাজার বছর আগে ইয়ামনের বাদশাহ ছিলেন তুব্বে আউয়াল হোমাইরী। 

তিনি একবার স্বীয় রাজ্য পরিভ্রমণে বের হয়েছিলেন। তাঁর সাথে ছিল বার হাজার আলেম ও হেকিম, এক লক্ষ বত্রিশ হাজার অশ্বারোহী এবং এক লক্ষ তের হাজার পদাতিক সিপাই। এমন শান-শওকতে বের হয়ে ছিলেন যে যেখানেই গেছেন, এ দৃশ্য দেখার জন্য চারিদিক থেকে লোক এসে জমায়েত হয়ে যেত। ভ্রমন করতে করতে যখন মক্কা মুয়াজ্জামায় পৌঁছলেন, তখন তাঁর এ বিশাল বাহিনীকে দেখার জন্য মক্কাবাসীর কেউ আসলেন না। বাদশাহ আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং উজীরে আযমকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। উজীর ওনাকে জানালেন, এ শহরে এমন একটি ঘর আছে যাকে 'বায়তুল্লাহ' বলা হয়। এ ঘর ও এ ঘরের খাদেমগণ ও এখানকার বাসিন্দাগণকে পৃথিবীর সমস্ত লোক সীমাহীন সম্মান করে। আপনার বাহিনী থেকে অনেক বেশী লোক নিকটবর্তী ও দূর-দূরান্ত থেকে এ ঘর জিয়ারত করতে আসে এবং এখানকার বাসিন্দাগণের সাধ্যমত খেদমত করে চলে যায়। তাই আপনার বাহিনীর প্রতি ওনাদের কোন আকর্ষণ নেই। এটা শুনে বাদশার রাগ আসলো এবং কসম করে বললেন, আমি এ ঘরকে ধূলিস্যাৎ করবো এবং এখানকার বাসিন্দাগণকে হত্যা করবো। 
এটা বলার সাথে সাথে বাদশাহর নাক মুখ ও চোখ থেকে রক্ত ঝরতে লাগলো এবং এমন দুর্গন্ধময় পুঁজ বের হতে লাগলো যে ওর পাশে বসার কারো সাধ্য রইলো না। 

এ রোগের নানা চিকিৎসা করা হলো কিন্তু কোন কাজ হলোনা। সন্ধ্যায় বাদশাহর সফর সঙ্গী ওলামায়ে কিরামের একজন আলেমে রব্বানী নাড়ী দেখে বললেন, রোগ হচ্ছে আসমানী কিন্তু চিকিৎসা হচ্ছে দুনিয়াবী। 

হে বাদশাহ মহোদয়! আপনি যদি কোন খারাপ নিয়ত করে থাকেন, তাহলে অনতিবিলম্বে সেটা থেকে তওবা করুন। 

বাদশাহ মনে মনে বায়তুল্লাহ শরীফ ও এর খাদেমগণ সম্পর্কিত স্বীয় ধারণা থেকে তওবা করলেন এবং তওবার সাথে সাথে রক্ত ঝরা ও পূঁজ পড়া বন্ধ হয়ে গেল। আরোগ্যের খুশীতে বাদশাহ বায়তুল্লাহ শরীফে রেশমী গিলাফ চড়ালেন এবং শহরের প্রত্যেক বাসিন্দাকে সাতটি সোনার মুদ্রা ও সাত জোড়া রেশমী কাপড় নজরানা দিলেন।

অতঃপর এখান থেকে মদীনা মনোয়ারা গেলেন, সফর সঙ্গী ওলামায়ে কিরামের মধ্যে যারা আসামানী কিতাব সমূহ সম্পর্কে বিজ্ঞ ছিলেন, তাঁরা সেখানকার মাঠি শুঁকে ও পাথর পরীক্ষা করে দেখলেন যে শেষ নবীর হিজরতের স্থানের যেসব আলামত তাঁরা পড়েছিলেন এ জায়গার সাথে এর মিল দেখলেন, তখন তাঁরা সংকল্প করলেন, আমরা এখানে মৃত্যু বরণ কররো এবং এ জায়গা ত্যাগ করে কোথাও যাব না। 

আমাদের কিসমত যদি ভাল হয়, তাহলে কোন এক সময় শেষ নবী তশরীফ আনলে আমরাও সাক্ষাত করার সৌভাগ্য লাভ করবো। অন্যথায় কোন এক সময় তাঁর পবিত্র জুতার ধূলি উড়ে আমাদের কবরের উপর নিশ্চয় পতিত হবে, যা আমাদের নাজাতের জন্য যথেষ্ট।

এটা শুনে বাদশাহ ওসব আলেমগণের জন্য চারশ ঘর তৈরী করালেন এবং সেই বড় আলেমে রব্বানীর ঘরের কাছে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর উদ্দেশ্যে দোতলা বিশিষ্ট একটি উন্নত ঘর তৈরী করালেন এবং অছিয়ত করলেন যে যখন তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তশরীফ আনবেন, তখন এ ঘর যেন তাঁর আরামগাহ হয়। ঐ চারশ আলেমগনকে যথেষ্ট আর্থিক সাহায্য করলেন এবং বললেন আপনারা এখানে স্থায়ীভাবে থাকুন। অতঃপর সেই বড় আলেমে রব্বানীকে একটি চিঠি লিখে দিলেন এবং বললেন, আমার এ চিঠি শেষ-নবীর খেদমতে পেশ করবেন। যদি আপনার জিন্দেগীতে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর আর্বিভাব না ঘটে, তাহলে আপনার বংশধরকে অছিয়ত করে যাবেন, যেন আমার এ চিঠিখানা বংশানুক্রমে হেফাজত করা হয়, যাতে শেষ পর্যন্ত শেষ নবীর খেদমতে পেশ করা যায়। এরপর বাদশাহ দেশে ফিরে গেলেন।

এ চিঠি এক হাজার বছর পর নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর খেদমতে পেশ করা হয়েছিল। কিভারে পেশ করা হয়েছিল এবং চিঠিতে কি লিখা ছিল, তা শুনুন এবং হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর শান-মানের বাস্তব নির্দশন অবলোকন করুন। 

চিঠির বিষয়বস্তু ছিল: —
"অধম বান্দা তুব্বে আউয়াল হোমাইরীর পক্ষ থেকে শফীয়ুল মুযনাবীন সৈয়্যদুল মুরসালীন মুহাম্মদ রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি,– 
হে আল্লাহর হাবীব, আমি আপনার উপর ঈমান আনিতেছি এবং আপনার প্রতি যে কিতাব নাযিল হবে, সেটার উপরও ঈমান আনতেছি। আমি আপনার ধর্মের উপর আস্থাশীল। অতএব যদি আমার আপনার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয়, তাহলে খুবই ভাল ও সৌভাগ্যের বিষয় হবে। আর যদি আপনার সাক্ষাত নছিব না হয়, তাহলে আমার জন্য মেহেরবাণী করে শাফায়াত করবেন এবং কিয়ামত দিবসে আমাকে নিরাশ করবেন না। আমি আপনার প্রথম উম্মত এবং আপনার আবির্ভাবের আগেই আপনার বায়াত করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ এক এবং আপনি তাঁর সত্যিকার রসূল।"

ইয়ামনের বাদশাহর এ চিঠি বংশানুক্রমে সেই চারশ ওলামায়ে কিরামের পরিবারের মধ্যে প্রাণের চেয়ে অধিক যত্ন সহকারে রক্ষিত হয়ে আসছিল। এভাবে এক হাজার বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। ওসব ওলামায়ে কিরামের সন্তান-সন্ততির সংখ্যা বেড়ে মদীনার অধিবাসী কয়েকগুন বৃদ্ধি পেল। এ চিঠি ও অছিয়ত নামাও সেই বড় আলেমে রব্বানীর বংশধরের মধ্যে হাত বদল হতে হতে হযরত আবু আয়ুব আনছারী (রাদিআল্লাহ আনহু) এর হাতে এসে পৌঁছে। তিনি এটা তাঁর বিশিষ্ট গোলাম আবু লাইলার হেফাজতে রাখেন। যখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মক্কা মুয়াজ্জামা থেকে হিজরত করে মদীনা মনোয়ারার প্রান্তসীমায় পর্দাপন করেন, সানিয়াতের ঘাটিসমূহ থেকে তাঁর উষ্ট্রী দৃষ্টি গোচর হলো, তখন মদীনার সৌভাগ্যবান লোকেরা মাহবুবে খোদার অভ্যর্থনার জন্য নারায়ে রেসালতের শ্লোগান দিয়ে দলে দলে এগিয়ে গেলেন, অনেকে ঘরবাড়ী সাজানো ও রাস্তা ঘাট পরিষ্কার পরিচ্চন্ন করার কাজে নিয়োজিত হলেন, অনেকে দাওয়াতের আয়োজন করতে লাগলেন, সবাই এটাই অনুনয়-বিনয় করছিলেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার ঘরে তশরীফ রাখুক। 
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, আমার উষ্ট্রীর লাগাম ছেড়ে দাও। যে ঘরের সামনে গিয়ে এটা দাঁড়াবে এবং বসে যাবে, সেটাই হবে আমার অবস্থানের জায়গা। 

উল্লেখ্য যে, ইয়ামনের বাদশাহ তুব্বে আউয়াল হোমাইরী হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর জন্য দোতলা বিশিষ্ট যে ঘর তৈরী করে ছিলেন, সেটা তখন হযরত আবু আয়ুব আনছারী (র.) এর অধীনে ছিল। উষ্ট্রী সেই ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। লোকেরা আবু লাইলাকে গিয়ে বললেন, ইয়ামনের বাদশাহর সেই চিঠিখানা হুযুরকে দিয়ে এসো। 

সে যখন হুযুরের সামনে হাজির হলো, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ওকে দেখে ফরমালেন তুমি আবু লাইলা? 

এটা শুনে আবু লাইলা আশ্চর্য হয়ে গেল। পুনরায় ফরমালেন, আমি মুহাম্মদ রসুলুল্লাহ, ইয়ামনের বাদশার সেই চিঠিটা যেটা তোমার হেফাযতে আছে, সেটা আমাকে দাও। 

অতঃপর আবু লাইলা সেই চিঠি হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)কে দিলেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চিঠি পাঠ করে ফরমালেন, নেক বান্দা তুব্বে আউয়ালকে অশেষ মুবারকবাদ। 
(মিজানুল আদিয়ান)। 

সবক : সর্বকালে আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর গুণকীর্তন হয়েছে। সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা হুযুর থেকে ফয়েজ লাভ করেছে। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আগে পরের সব বিষয় জানেন। উপরোক্ত কাহিনী থেকে এটাও বুঝা গেল যে, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর আর্বিভাবের আনন্দে ঘর-বাড়ী সজ্জিত করা সাহবায়ে কিরামের সুন্নাত। আজ যারা হুযুরের আবির্ভাবের আনন্দে ঘরবাড়ী হাট-বাজার সজ্জিত করা ও আনন্দ মিছিল বের করাকে বেদআত বলে, তারা নিজেরাই বড় বিদাতী।

কাহিনী নং- ৬
হযরত ছিদ্দিকে আকবর (রাদি আল্লাহু আনহু) এর স্বপ্ন—
হযরত ছিদ্দিকে আকবর (রাদি আল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণের আগে অনেক বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি তখন ব্যবসায়িক ব্যাপারে একবার সিরিয়া গিয়েছিলেন। তথায় একরাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, আসমান থেকে চাঁদ সূর্য অবতীর্ণ হয়ে তাঁর কোলের উপর এসে পড়ে। তিনি স্বীয় হাতে চাঁদ, সূর্যকে ধরে বুকে লাগালেন এবং নিজের চাদরে জড়িয়ে নিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি এক ঈসায়ী পাদরীর কাছে গেলেন এবং ওর কাছে সেই স্বপ্নের তাবীর জিজ্ঞেস করলেন। পাদরী তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে? তিনি বললেন, আমার নাম আবু বকর, আমি মক্কার অধিবাসী। পাদরী জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোন্ গোত্রের লোক? বললেন, বনু হাশেমের। জিজ্ঞেস করলেন, জীবিকার উৎস কি? উত্তর দিলেন, ব্যবসা। এবার পাদরী বললেন, মনোযোগসহকারে শুনুন, শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তশরীফ এনেছেন। তিনিও সেই বনী হাশেম গোত্রের অন্তর্ভূক্ত, তিনিই শেষ নবী। যদি তিনি না হতেন, আল্লাহ তাআলা জমীন আসমান কিছুই সৃষ্টি করতেন না। অন্য কোন নবীও সৃষ্টি করতেন না। তিনি সকল নবীর সরদার। 

হে আবু বকর! আপনি তাঁর ধর্মে শামিল হয়ে যাবেন, তাঁর উজীর হবেন এবং তাঁর পরে তাঁর খলিফা মনোনিত হবেন। এটাই আপনার স্বপ্নের তাবীর। এটাও জেনে নিন যে আমি এ মহান নবীর প্রশংসা ও গুনকীর্তন তাওরাত ও ইনজিল কিতাবে পড়েছি, আমি তাঁর উপর ঈমান এনেছি এবং মুসলমান হয়েছি। কিন্তু ঈসায়ীদের ভয়ে স্বীয় ঈমান প্রকাশ করিনি।

হযরত ছিদ্দিকে আকবর (রাদিআল্লাহু আনহু) যখন তাঁর স্বপ্নের এ তাবীর শুনলেন, তখন মনের মধ্যে ইশকে রসূলের জজবা সৃষ্টি হলো, কাল বিলম্ব না করে মক্কায় ফিরে আসলেন এবং হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সন্ধান নিয়ে হুযুরের দরবারে হাজির হলেন এবং হুযুরকে দেখে চক্ষু জুড়ালেন। 
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন আবু বকর, তুমি এসে গেছ? আর দেরী কর না। তাড়াতাড়ি সত্য ধর্মে দাখিল হয়ে যাও। ছিদ্দিকে আকবর বললেন, খুবই ভাল কথা হুযুর। তবে কোন একটা মুজিজা দেখালে খুশি হতাম। হুযুর ফরমালেন, যে স্বপ্ন তুমি সিরিয়ায় দেখে এসেছ এবং পাদরীর মুখ থেকে যে তাবীব শুনে এসেছ, সেটাইতো আমার মুজিজা। ছিদ্দিকে আকবর এটা শুনে আরয করলেন, হে আল্লাহর রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আাপনি সত্য বলেছেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি বাস্তবিকই আল্লাহর সত্যিকার রসুল। (জামেউল মুজিজাত ৪ পৃঃ)

সবক: হযরত আবু বকর ছিদ্দিক (রাদি আল্লাহু আনহু) হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর উজীর ও বরহক খলিফা। আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে কোন কথা গোপন থাকে না। তিনি অদৃশ্য জ্ঞানী। এটাও জানা গেল যে, সমস্ত সৃষ্টিকুল আমাদের হুযুরের বদৌলতে সৃষ্টি করা হয়েছে। হুযুর না হলে কিছুই হতো না। এক উর্দু কবি সুন্দর বলেছেনঃ
"তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) না হলে কিছুই হতো না। তিনি জগতের প্রাণ। প্রাণ আছে বলেই জগত বহাল আছে।

কাহিনী নং- ৭
ইবলিসের পৌত্র—
বায়হাকী শরীফে আমীরুল মুমেনীন হযরত ওমর ফারুক (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে, একদিন আমরা হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে তাহামার একটি পাহাড়ের উপর বসেছিলাম। হঠাৎ এক বৃদ্ধ লাঠির উপর ভর দিয়ে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সামনে হাজির হলো এবং সালাম পেশ করলো। হুযুর সালামের জবাব দিলেন এবং ফরমালেন ওর আওয়াজটা জীনের আওয়াজের মত মনে হচ্ছে। পুনরায় 'হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ওকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? 
সে আরয করলো, হুযুর আমি জ্বীন। আমার নাম হামা, হীমের ছেলে, হীম হলো লাকীসের ছেলে এবং লাকীস হচ্ছে ইবলিসের ছেলে। হুযুর ফরমালেন, তাহলে তো তোমার ও ইবলিসের মধ্যে মাত্র দু প্রজন্মের ব্যবধান। 
পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বয়স কত? সে বললো, ইয়া রাসুলল্লাহ, মানব জাতীর যতটুকু বয়স, আমারও বয়স ততটুকু হবে। তবে কিছু কম হতে পারে। যেদিন কাবিল হাবিলকে হত্যা করেছিল সেই সময় আমি কয়েক বছরের শিশু ছিলাম। তবে কথাবার্তা বুঝতাম। পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ি করতাম। মানুষের খাদ্য শস্য চুরি করে নিয়ে আসতাম। মানুষের মনে কুমন্ত্রনাও দিতাম, যাতে ওরা আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাথে অসদ্বাচরণ করে।

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, তাহলে তো তুমি খুবই খারাপ। সে আরয করলো, হুযূর আমাকে ভৎসনা করবেন না। আমি আপনার সমীপে তওবা করতে এসেছি। 
ইয়া রাসুলল্লাহ, আমি হযরত নূহ আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ করেছি এবং এক বছর তাঁর সাথে মসজিদে অবস্থান করেছি। আমি তাঁর বারগাহেও তওবা করেছি। হযরত হুদ, হযরত ইয়াকুব ও হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সংশ্রবেও ছিলাম এবং তাঁদের থেকে তাওরাত শিখেছি এবং ওনাদের সালাম হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে পৌঁছায়েছি। হে নবীগণের সরদার! হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, 'যদি তোমার সাথে মুহাম্মদ রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সাক্ষাৎ হয়, তাহলে আমার সালাম ওনাকে পৌছাইও'। তাই হুযুর এখন আমি সেই আমানত থেকে দায়মুক্ত হওয়ার জন্য আপনার সমীপে হাজির হয়েছি। এটাও আশা আছে যে আপনার পবিত্র জবানে আমাকে কিছু আল্লাহের কালাম শিক্ষা দিবেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ওকে সূরা মুরসেলাত, সূরা আম্মা ইতাসাআলুন, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাছ এবং ইজাশাশামস শিক্ষা দিলেন। আরও ফরমালেন, হে হামা যখন তোমার কোন প্রয়োজন হয়, আমার কাছে আসিও এবং আমার সংশ্রব ত্যাগ করিও না।

হযরত ওমর ফারুক (রাদি আল্লাহু আনহু) বলেন, হুযুর আলাইহিস সালাম তো বেছাল ফরমালেন কিন্তু হামা সম্পর্কে কিছু বলে যান নি। আল্লাহ্ জানেন, হামা কি এখনও জীবিত আছে, নাকি মারা গেছে। (খোলাছাতুত তাফাসীর ১৭০ পৃঃ)।

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মানব, জ্বীন, সকলের রসূল। তাঁর দরবার জ্বীন ও ইনসান সকলের জন্য উন্মুক্ত।

কাহিনী নং- ৮
পবিত্র হত্যাকারী—
মক্কা মুয়াজ্জমায় অলিদ নামে এক কাফির বাস করতো। ওর একটি সোনার মূর্তি ছিল। সেটার সে পূজা করতো। একদিন সেই মূর্তির মধ্যে নড়াচাড়া লক্ষ্য করা গেল এবং সেই মূর্তি বলতে লাগলো, হে মানবগণ, মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল নয়। ওকে কখনও বিশ্বাস কর না (মায়াজাল্লা)। 

অলিদ দারুন খুশী হলো, বাইরে গিয়ে বন্ধু বান্ধবদেরকে বললো, সুসংবাদ, আজ আমার মাবুদ কথা বলেছে। সুস্পষ্টভাবে বলেছে যে মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল নয়। এটা শুনে লোকেরা ওর ঘরে এসে দেখলো যে বাস্তবিকই মূর্তি একথাটা বার বার বলতেছে যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল নয়। ওরাও দারুন খুশী হলো। পরের দিন ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে অলিদের ঘরে বিরাট জমায়েতের ব্যবস্থা করা হলো যাতে সবাই মূর্তির মুখ থেকে সেকথাটা শুনতে পায়। লোকেরা হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম)-কেও আমন্ত্রণ জানালো যেন হুযুরও এসে মূর্তির মুখে সেই কথাটা শুনেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) যখন তশরীফ নিয়ে গেলেন তখন সেই মূর্তি বলে উঠলো; হে মক্কাবাসী, ভাল মতে জেনে নাও, মুহাম্মদ আল্লাহর সত্যিকার রসূল। তাঁর প্রতিটি বাণী সত্য। তাঁর ধর্ম বরহক। তোমরা এবং তোমাদের মূর্তি মিথ্যা, পথ ভ্রষ্ট এবং পথ ভ্রষ্টকারী। তোমরা যদি এ সত্যিকার রসূলের প্রতি ঈমান না আন, তাহলে জাহান্নামে যাবে। অতএব বুদ্ধি মত্তার সাথে কাজ কর এবং এ সত্যিকার রসূলের গোলামী গ্রহণ কর।”

মূর্তির এ বক্তব্য শুনে অলিদ ভীষণ ঘাবড়িয়ে গেল এবং স্বীয় মাবুদকে হাতে নিয়ে মাটিতে নিক্ষেপ করে টুকরা টুকরা করে ফেললো।

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) বিজয়ী বেশে ওখান থেকে রওয়ানা হলেন। পথে সবুজ পোষাকধারী এক অশ্বারোহী হুযুরের সাথে সাক্ষাৎ করলেন, ওর হাতে একটি তলোয়ার ছিল, যার থেকে রক্ত পড়ছিল। হুযুর জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? সে বললো, হুযুর, আমি জ্বীন এবং আপনার একজন নগণ্য গোলাম ও মুসলমান। আমি তুর পাহাড়ে থাকি। আমার নাম মহিন ইবনুল আবর। আমি কিছু দিনের জন্য অন্যত্র গিয়ে ছিলাম। আজই ঘরে ফিরে এসেছি। ঘরে এসে দেখি আমার পরিবারের সদস্যরা কাঁদতেছে। এর কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে এক কাফির জ্বীন যার নাম মুসাফফর সে মক্কা গিয়ে অলিদের মুর্তির মধ্যে প্রবেশ করে হুযুরের বিরুদ্ধে যা-তা বলে এসেছে।
আজও রওয়ানা হয়েছিল আপনার সম্পর্কে যা-তা বলার জন্য। ইয়া রসুলল্লাহ এটা শুনে আমার ভীষন রাগ আসলো। তাই তলোয়ার নিয়ে ওর পিছে ছুটলাম এবং রাস্তায় তাকে হত্যা করে ফেলেছি। অতপর আমি নিজেই অলিদের মূর্তির ভিতরে প্রবেশ করে আজ- কের এ বক্তব্য রাখলাম, ইয়া রসূলল্লাহ।

হযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এ ঘটনা শুনে খুবই সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন এবং তাঁর এ আনুগত্য জ্বীনের জন্য দুআ করলেন। (জামেউল মুজিজাত-৮ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) জ্বীনদের রসূল এবং হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র শান মানের বিপরীত কোন কিছু শুনানোর জন্য সমাবেশ করা অলিদের মত কাফিরের সুন্নাত।

কাহিনী নং- ৯
তন্ত্র মন্ত্র দ্বারা চিকিৎসাকারী—
ইয়ুশানূয়া গোত্রের জামাদ নামক এক ব্যক্তি তন্ত্র মন্ত্র দ্বারা মানুষের উপর জ্বীন-ভূত ইত্যাদির আছরের চিকিৎসা করতো। একবার সে মক্কা মুয়াজ্জামায় গিয়েছিল। তখন কতেক লোককে এটা বলতে শুনলো যে মুহাম্মদের উপর জ্বীনের আছর হয়েছে বা পাগল হয়ে গেছে (মায়াজাল্লা)। জামাদ বললো, আমি তন্ত্র মন্ত্র দ্বারা এ রকম রোগের চিকিৎসা করে থাকি। আমাকে দেখাও, সে এখন কোথায়? ওরা ওকে হুযুরের কাছে নিয়ে গেল। জামাদ যখন হুযুরের কাছে গিয়ে বসলো, তখন হুযুর ফরমালেন, জামাদ, তোমার তন্ত্র মন্ত্র পরে শুনাও, প্রথমে আমার কথা শুন, অতপর তিনি তাঁর পবিত্র মুখে এ খুৎবাটি পড়তে শুরু করলেন:

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, তাঁরই প্রশংসা করছি। তাঁরই সাহায্য কামনা করছি এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তাঁর উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁর উপর ভরসা করেছি। আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি নফসের কুমন্ত্রনা থেকে এবং মন্দ আমল থেকে। আল্লাহ যাকে হিদায়েত করে তাকে কেউ গুমরাহ করতে পারে না আর যাকে গুমরাহ করে, তাকে কেউ হিদায়েত করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই আরও সাক্ষী দিচ্ছি মুহাম্মদ তাঁরই বান্দাও রসূল।

জামাদ এ খুৎবা শুনে বিভোর হয়ে গেল এবং আরয করতে লাগলো, হুযুর! পুনরায় আর একবার পড়ুন। হুযুর পুনরায় সেই খুৎবা পাঠ করলেন। এবার জামদ (যে জ্বীনের আছর তাড়াতে এসেছিল, তার উপর থেকে কুফরীর আছর কিভাবে দূরীভূত হলো, দেখুন) আর স্থির থাকতে পারলো না। বলে উঠলো, খোদার কসম, আমি অনেক যাদুকর জ্যোতিষী ও কবিদের কথা শুনেছি। কিন্তু আপনার থেকে যা শুনেছি, এটাতো অর্থের দিক দিকে এক বিশাল সমুদ্র। আপনার পবিত্র হাত বাড়িয়ে দিন, আমি আপনার হাতে বায়াত হচ্ছি। এ বলে সে মুসলমান হয়ে গেল এবং যারা ওকে হুযূরের চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছিল, তারা আশ্চর্য ও নিরাশ হয়ে ফিরে গেল (মুসলিম ৩২০পৃঃ ১ম জিঃ)।

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র মুখে এমন তাছির ছিল যে, বড় বড় পাষাণ হৃদয়ও গলে মোম হয়ে যেত। আমাদের হুযুরকে যারা যাদুকর ও পাগল বলতো, বাস্তবে ওরাই পাগল ছিল। অনুরূপ আজও যারা হুযুরের জ্ঞান ও ক্ষমতা এবং নূরের অস্বীকার করে, তারাও মূলতঃ নিজেরাই মূর্খ, কুটিল মনা ও মলিন চেহারাধারী।

কাহিনী নং-১০
রোকানা পলোয়ান—
বনী হাশেম গোত্রে রোকানা নামে এক মুশরিক পলোয়ান ছিল। সে খুব শক্তিশালী ও সাহসী ছিল। ওকে কেউ পরাভূত করতে পারেনি। সে ইজম নামে এক জংগলে থাকতো, ওখানে ছাগল চড়াতো এবং খুবই সম্পদশালী ছিল। একদিন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) একাকী সেই জংগল দিয়ে যাচ্ছিল। রোকানা তাঁকে দেখে সামনে এসে বললো, হে মুহাম্মদ! তুমিতো সেই ব্যক্তি, যে আমাদের দেবতা লাত ও উজ্জার কুৎসা রটনা ও ঘৃনা কর এবং স্বীয় এক খোদার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা কর। তোমার প্রতি যদি আমার সহানুভূতি না থাকতো, তাহলে আজ আমি তোমাকে মেরে ফেলতাম। যাক আমার সাথে কুস্তি লড়তে এসো, তুমি তোমার খোদাকে ডাক আর আমি আমার লাত ও উজ্জাকে ডাকতেছি। দেখি, তোমার খোদার কাছে কত শক্তি আছে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, তুমি যদি সত্যি কুস্তি লড়তে চাও, তাহেল চল, আমি প্রস্তুত আছি। রোকানা এ জবাব শুনে প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেল। পরে ভীষণ অহংকারের সাথে কুস্তি লড়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেল।

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) প্রথম ধাক্কায় ওকে ফেলে দিলেন এবং ওর বুকের উপর বসে গেলেন। রোকানা জীবনে এই প্রথমবার ধরাশায়ী হয়ে বড় লজ্জিত ও আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেল। সে বললো, হে মুহাম্মদ! আমার বুক থেকে উঠে যাও। আমার লাত ও উজ্জা আমার দিকে খেয়াল করেনি। আর একবার কুস্তি লড়ার সুযোগ দাও। হুযূর ওর বুক থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন। রোকানাও দ্বিতীযবার কুস্তির জন্য দাঁড়ালো। এবারও রোকানাকে চোখের পলকে ফেলে দিলেন। রোকানা বললো, হে মুহাম্মদ! মনে হয় আজ আমার লাত ও উজ্জা আমার উপর নারাজ। তোমার খোদা তোমাকে সাহায্য করতেছে। যাক চল, আর একবার লড়ে দেখি। এবার লাত ও উজ্জা নিশ্চয় আমাকে সাহায্য করবে। হুযূর তৃতীয় বারও কুস্তি লড়ায় জন্য রাজি হয়ে গেলেন এবং তৃতীয় বারও ওকে পরাভূত করলেন। এবার রোকানা বড় লজ্জিত হলো এবং বললো, হে মুহাম্মদ! আমার ছাগলগুলোর মধ্যে থেকে যতটি চাও নিয়ে যাও। হুযূর ফরমালেন রোকানা আমার তোমার সম্পদের প্রয়োজন নেই। তবে মুসলমান হয়ে যাও, যাতে জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পার। সে বললো, হে মুহাম্মদ! মুসলমানতো হয়ে যেতে পারি কিন্ত মনে সঙ্কোচবোধ হচ্ছে মদীনা ও এর পাশ্ববর্তী এলাকার মহিলারা ও শিশুরা বলবে যে এত বড় পলোয়ান পরাজিত হলো এবং মুসলামান হয়ে গেল। তোমার সম্পদ নিয়ে তুমি থাক, এ বলে হুযূর ফিরে চলে আসলেন। এদিকে হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রাদি আল্লাহু আনহুমা) তাঁর তালাশে বের হলেন এবং হুযূর ইজমের জংগলের দিকে তশরীফ নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে খুবই চিন্তিত ছিলেন। কেননা ওদিকে রোকানা পলোয়ান থাকে, হয়তো হুযূরকে কষ্ট দিতে পারে। যাক হুযূরকে ফিরে আসতে দেখে উভয়ে হুযূরের খেদমতে হাজির হলেন এবং আরয করলেন, ইয়া রসুলল্লাহ! আপনি ওদিকে কেন গেলেন, আপনি কি জানেন না যে ওদিকে ইসলামের পরম শত্রু রোকানা থাকে? হুযূর এটা শুনে মুচকি হেসে বললেন, যখন আমার আল্লাহ সব সময় আমার সাথে আছে, তখন রোকানাকে ভয় করার কি আছে? রোকানার বাহাদুরীর কাহিনী শুন-এ বলে তিনি সমস্ত কাহিনী শুনালেন। হযরত ছিদ্দিকে আকবর ও ওমর ফারুক এ ঘটনা শুনে খুবই খুশী হলেন এবং আরয করলেন, হুয়ূর সে এমন পলোয়ান ছিল যে আজ পর্যন্ত ওকে কেউ ফেলতে পারেনি। ওকে ফেলাটা একমাত্র আল্লাহর রসূলের কাজ। (আবু দাউদ ২০ পৃঃ ২ জিঃ)।

সবক : আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক ফযীলত ও কামালিয়াতের ভাণ্ডার। দুনিয়ার কোন শক্তি হুযুরের সামনে অটল থাকতে পারে না। বিরোধীতাকারীরাও হুযূরের ফযীলত ও কামালিয়াত সম্পর্কে জ্ঞাত কিন্তু দুনিয়াবী লজ্জার কারণে স্বীকার করে না।

কাহিনী নং – ১১
হযরত খালিদ বিন অলিদ (রাদিআল্লাহু আনহু) এর টুপি—
হযরত খালিদ বিন অলিদ (রাদিআল্লাহ আনহু) সায়ফুল্লাহ (আল্লাহর তলোয়ার) হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তিনি যে কোন যুদ্ধে যাবার সময় স্বীয় টুপি নিশ্চয়ই মাথার উপর রাখতেন এবং সব সময় জয়ী হয়ে ফিরতেন। কোন সময় পরাজয়ের মুখ দেখেননি। একবার ইয়ারমুকের যুদ্ধে যখন যুদ্ধের ময়দান উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, তখন তাঁর টুপিটা কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। তিনি যুদ্ধ করা বাদ দিয়ে টুপি খুঁজতে লাগলেন। এদিকে শত্রুদের পক্ষ থেকে তীর পাথর নিক্ষেপ করা হচ্ছিল। সৈন্যরা মৃত্যু সন্নিকটে মনে করতে লাগলো। এ অবস্থায়ও হযরত খালিদ টুপির খোঁজে মগ্ন রইলেন। সৈন্যরা ওনাকে গিয়ে বললেন, জনাব টুপির চিন্তা বাদ দিন, যুদ্ধ শুরু করুন। হযরত খালিদ ওদের কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। তিনি তাঁর অনুসন্ধান যথারীতি চালিয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত টুপি পাওয়া গেল। তিনি খুবই আনন্দিত হয়ে সবাইকে তাঁর টুপি প্রাপ্তির কথা জানালেন এবং বললেন, প্রিয় ভাইয়েরা! এ টুপি আমার এত প্রিয় কেন জানেন? আমি আজ পর্যন্ত যত যুদ্ধে জয়ী হয়েছি সব এ টুপিরই বদৌলতে। আমার কোন বাহাদুরী নেই, সব এ টুপিরই বরকত। এ টুপি না থাকলে আমি কিছু না। আর যদি এ টুপি আমার মাথায় থাকে তাহলে যতবড় শত্রু হোক না কেন আমার সামনে কিছুইনা। সৈন্যরা জানতে চাইলেন, এ টুপিতে এমন কি বৈশিষ্ট্য আছে? তিনি বললেন, দেখুন এখানে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর চুল মুবারক রয়েছে, যেটাকে আমি এটার সাথে সেলাই করে রেখেছি। একবার হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর ওমরাহ পালন করার সময় আমি সাথে ছিলাম। ওমরার পর যখন তিনি তাঁর পবিত্র মস্তকের চুল মুবারক কাটালেন তখন এ চুল হস্তগত করার জন্য আমরা যারা উপস্থিত ছিলাম সবাই ঝাপিয়ে পড়েছিলাম। ভাগ্যক্রমে আমি কয়েকটি চুল হস্তগত করতে পেরেছিলাম। সেই চুল মুবারককে আমি এ টুপিতে যত্নসহকারে সেলাই করে রেখেছি। ফলে এ টুপি আমার জন্য সকল বরকত ও জয়ের উসীলা হয়ে গেল। আমি এর বদৌলতে প্রতিটি যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী হই। তাই আপনারাই বলুন, এ টুপি খুঁজে পাওয়া না গেলে কিভাবে আমার স্বস্থি বোধ হতো? (হুজ্জাতুল্লাহে আলাল আলামীন ৬৮৬ পৃঃ)

সবক: হুযুর সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম সকল বরকত ও অবদানের উসীলা। তাঁর চুল মুবারক বরকত ও রহমতের সহায়ক। সাহাবায়ে কিরাম (রাদি আল্লাহু আনহুম) হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম)  এর সংশ্লিষ্ট সব কিছুকে তাবারুক হিসেবে নিজেদের কাছে রাখতেন। যার কাছে তাঁর নগন্য চুল মুবারক থাকতো, আল্লাহ তাআলা ওকে সব কাজে কামিয়াব করতেন।

কাহিনী নং - ১২
চুল মুবারকের কামালিয়াত—
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর দু'টি পবিত্র চুল হযরত ছিদ্দিকে আকবর (রাদিআল্লাহু আনহু) পেয়ে ছিলেন। তিনি চুল দু'টি তাবারুক হিসেবে ঘরে নিয়ে এলেন এবং যথাযথ সম্মানের সাথে যত্নসহকারে ঘরের ভিতরে কোন এক জায়গায় রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ পর ঘরের অভ্যন্তরে কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পেলেন। ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখলেন, তখনও কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। হযরত ছিদ্দিকে আকবর (রাদি আল্লাহু আনহু) হুযুরের খেদমতে হাজির হয়ে সমস্ত ঘটনা আরয করলেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) মুছকি হেসে বললেন,– "এরা ফিরিশতা, আমার চুল মুবারকের কাছে সমবেত হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেছে"। (জামেউল মুজিজাত ৬২ পৃঃ)

সবক: হুযুর সরওয়ারে আলম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর প্রতিটি চুল মুবারক কামালিয়াতের ভাণ্ডার। তাঁর চুল মুবারক সৃষ্টি কুলের জন্য দর্শনীয় ও বরকত লাভের নিদর্শন। যেসব লোকের চুল মুন্ডায়ে নাপিতেরা নালা নর্দমায় ফেলে দেয়, ওরা যদি হুযূরের মত মানুষ বলে দাবী করে, তাহলে ওদের মত বদতমীজ (বেয়াদব) আর কে হতে পারে?

কাহিনী নং - ১৩
ছাগল জীবিত হয়ে গেল—
আহযাবের যুদ্ধে হযরত জাবের (রাদিআল্লাহু আনহু) হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) কে দাওয়াত করলেন এবং একটি ছাগল জবেহ করলেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে যখন ওনার ঘরে গেলেন, তখন তিনি খাবার এনে হুযূরের সামনে রাখলেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) দেখলেন যে খাবারের তুলনায় মেহমানের সংখ্যা অনেক বেশী। তখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, কয়েক জন করে এসে খানা খেয়ে যাও। এভাবে কয়েক জন করে সবাই খানা খেয়ে বের হয়ে গেলেন। হযরত জাবের (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেন, হুযুর আগ থেকে বলে দিয়েছিলেন যে কেউ যেন মাংসের হাড্ডি না ভাঙ্গে এবং এদিক সেদিক ফেলেও না দেয়। সবগুলো যেন এক জায়গায় রাখে। সবাই যখন খেয়ে নিলেন, তখন তিনি নির্দেশ দিলেন, ছোট বড় সব হাড্ডি একত্রিত করে ফেল। অতঃপর তিনি তাঁর পবিত্র হাত মুবারক ওগুলোর উপর রেখে কিছু পাঠ করলেন। হাত মুবারক তখনও হাড্ডির উপর ছিল এবং পবিত্র মুখে কিছু পড়তে ছিলেন, এ দিকে দেখা গেল হাড্ডির মধ্যে কিছু একটা পরিবর্তন হচ্ছে। দেখতে দেখতে হাড্ডিতে মাংসের শরীর গঠন হয়ে কান ঝাড়া দিয়ে সেই ছাগল দাঁড়িয়ে গেল। হুযূর ফরমালেন, জাবের, তোমার ছাগল তুমি নিয়ে যাও। (দলায়েলে নবুয়াত ২৪ পৃঃ, ২ জিঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) হায়াতের উৎস ও হায়াত দানকারী। তিনি মৃত প্রাণ ও মৃত শরীরকেও জীবিত করে দিয়েছেন। এরপরেও যারা (মাযাল্লা) হুযূর মরে মাটির সাথে মিশে গেছে বলে, তারা কত বড় মুর্খ ও বেদীন।

কাহিনী নং - ১৪
সাপের ডিম—
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত হাবীব বিন ফদীক (রাদিআল্লাহু আনহু) কোন এক জায়গায় যাচ্ছিলেন। ঘটনাক্রমে উনার পা একটি বিষাক্ত সাপের ডিমের উপর পড়েছিল। এতে ডিমটি ফেটে যায় এবং এর বিষ ক্রিয়ায় হযরত হাবীব বিন ফদীক (রাদিআল্লাহু আনহু) এর চোখ একেবারে ঘোলা হয়ে যায় এবং দৃষ্টি শক্তি লোপ পায়। এ অবস্থা দেখে ওনার পিতা খুবই হতাশ হয়ে পড়লো এবং ওনাকে নিয়ে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর খেদমতে হাজির হলেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) সমস্ত ঘটনা শুনে ওনার চোখে থুথু দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ওনার চোখ পরিষ্কার হয়ে গেল এবং দৃষ্টি শক্তি ফিরে ফেলেন। ঘটনা বর্ণনাকারী বলেন, আমি স্বয়ং হযরত হাবীবকে দেখেছি। ঐ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল আশি বছর এবং চোখ একেবারে ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল কিন্তু হযূরের থুথু মুবারকের বদৌলতে দৃষ্টি শক্তি এত প্রখর ছিল যে সুঁই এ সূতা গাঁথিতে পারতেন। (দালায়েলে নবুয়াত ১৬৫ পৃঃ)

সবক : হুযূরকে যারা আমাদের মত মানুষ বলে, এ কাহিনী থেকে তাদের শিক্ষা গ্রহণ করা দরকার। হুযূরের থুথু মুবারক দ্বারা অন্ধের চোখে দৃষ্টি শক্তি ফিরে আসে আর ওদের খুথুর ব্যাপারে গাড়ী ঘোড়ায় লিখে দেয়া হয় যেখানে সেখানে থুথু ফেলিওনা, এর দ্বারা রোগ বিস্তার লাভ করে। তাহলে রোগ আরোগ্য উভয়টা কিভাবে বরাবর হতে পারে?

কাহিনী নং-১৫
হযরত জাবেরের ঘর ও এক হাজার মেহমান—
হযরত জাবের (রাদিআল্লাহু আনহু) খন্দকের যুদ্ধে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র পেটের উপর পাথর বাঁধা দেখে ঘরে এসে বিবি সাহেবাকে বললেন, ঘরে এমন কিছু আছে যা রান্না করে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) কে খাওয়াতে পারি? বিবি সাহেবা বললেন, সামান্য আটা আছে এবং ছাগলের একটা ছোট বাছুর আছে, সেটা জবেহ করতে পারেন। হযরত জাবের বললেন, ঠিক আছে আমি ছাগলটা জবেহ করে দিয়ে যাচ্ছি, তুমি সেটা ভালমতে রান্না কর। আমি গিয়ে হুযূরকে নিয়ে আসতেছি। বিবি সাহেবা বললেন, দেখুন সেখানে অনেক লোক আছে, আপনি হুযূরকে চুপে চুপে বলবেন যেন সাথে দশের অধিক লোক নিয়ে না আসেন। সেমতে হযরত জাবের হুযুরের খেদমতে গিয়ে কানে কানে বললেন, হুযূর আমি সামান্য খাবারের আয়োজন করেছি, আমার সাথে চলুন এবং অনধিক দশজন আপনার সাথে নিতে পারেন। কিন্তু হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) পুরো বাহিনীকে সম্বোধন করে বললেন, চল সবাই আমার সাথে চল, জাবের খাবারের আয়োজন করেছে। অতঃপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) জাবেরের ঘরে এসে সেই সামান্য আটায় থুথু ফেললেন। অনুরূপ মাংসের ডেকসিতেও থুথু ফেললেন। এরপর নির্দেশ দিলেন, রুটি তৈরী কর এবং মাংস পাকাও। সামান্য আটা ও মাংসে থুথু মুবারকের বদৌলতে এত বরকত হলো যে এক হাজার ব্যক্তি তৃপ্তি সহকারে খাবার গ্রহণ করলো কিন্তু রুটি ও মাংসে কোনটায় কমতি হলো না। (মিশকাত শরীফ ৫২৪ পৃঃ)

সবক: এটা হুযুরের থুথু মুবারকের বরকত ছিল যে সামান্য খাবার এক হাজার জন তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পরও অবিকল রয়ে গেল, কোন কমতি হলো না। যারা হুযূরকে ওদের মত মানুষ মনে করে, তারা যদি তাদের নিজ ঘরের কোন ডেকসিতে থুথু ফেলে, তাহলে ওদের ঘরের বিবিরাই সেই ডেকসিকে বাইরে ফেলে দিবে। কেউ সেই ডেকসির খাবার খাবে না।

কাহিনী নং - ১৬
সুরাইতে সমুদ্র—
হুদাইরিয়ার সন্ধির দিন সাহাবায়ে কিরামের পানি শেষ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি অযু ও পান করার জন্য এক ফোঁটা পানি অবশিষ্ট ছিল না। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর কাছে এক সুরাই পানি ছিল। হুযূর যখন সেই সুরাই থেকে অযু করছিলেন, তখন সবাই হুযুরের পাশে সমবেত হলেন এবং ফরিয়াদ করলেন, ইয়া রাসুলল্লাহ! আমাদের কাছে তো এক ফোঁটা পানিও অবশিষ্ট নেই, আমরা অযুও করতে পারছিনা এবং তৃষ্ণাও নিবারণ করতে পারছি না। আমরা তৃষ্ণায় অস্থির হয়ে পড়েছি। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) একথা শুনে স্বীয় হাত মুবারক সুরাইতে ডুবালেন। লোকেরা দেখলেন যে হুযূরের হাত মুবারকের পাঁচ আঙ্গুল দিয়ে পাঁচটি ঝর্ণা প্রবাহিত হলো। সবাই সেই ঝর্না সমূহ থেকে পানি সংগ্রহ করতে লাগলেন এবং প্রত্যেকে ইচ্ছা মাফিক পানি পান করলেন এবং অযু করে নিলেন। হযরত জাবেরের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে তখন কত লোক ছিল? তিনি বললেন, ঐ সময় যদি এক লক্ষ লোকও হতো, পানির কমতি হতো না। তবে আমরা ঐ সময় পনের'শ ছিলাম। (মিশকাত শরীফ ৫২২পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযূরকে আল্লাহ তাআলা এ এখতিয়ার ও ক্ষমতা দান করেছেন যে তিনি সামান্য জিনিসকে অধিক করে দিতে পারেন। না থেকে হ্যাঁ, অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্ববান করা আল্লাহর কাজ এবং সামান্য থেকে অধিক করা মুস্তাফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর কাজ। এটা আল্লাহর বিশেষ দান।

কাহিনী নং - ১৭
এক মরুযাত্রী কাফেলা—
আরবের মরুভূমির মধ্যে দিয়ে এক বিরাট কাফেলা যাচ্ছিল, হঠাৎ ওদের পানি শেষ হয়ে যায়। সেই কাফেলায় বড়, ছোট, বৃদ্ধ, যুবক মহিলা সবাই ছিল। তৃষ্ণার তাড়নায় সবের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়েছিল। অনেক দূর পর্যন্ত পানির কোন নাম নিশানা ছিল না। ওদের কাছে এক ফোঁটা পানিও অবশিষ্ট ছিল না। এ অবস্থা দেখে মুত্যু ওদের সামনে নৃত্য করতে লাগলো। কিন্তু ওদের প্রতি বিশেষ রহমত হলো।

হঠাৎ উভয় জাহানের সাহায্যকারী মুহাম্মদ মুস্তাফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) ওদের সাহায্যার্থে তথায় পৌঁছে গেলেন। হুযূরকে দেখে সবার দেহে প্রাণ ফিরে আসলো। সবাই হুযুরের চারিদিকে সমবেত হয়ে গেল। হুযূর ওদেরকে সান্তনা দিলেন এবং ফরমালেন, সামনে যে টিলা আছে, এর পিছন দিয়ে এক কাল রং এর হাবশী গোলাম উষ্ট্রীর উপর আরোহন করে যাচ্ছে। ওর কাছে পানির একটি মোশক আছে। ওকে উষ্ট্রীসহ আমার কাছে নিয়ে এসো। নির্দেশ মত কয়েকজন টিলার ওপারে গিয়ে দেখলো যে বাস্তবিকই উষ্ট্রীই উপর আরোহন করে এক হাবশী যাচ্ছে। ওরা সেই হাবশীকে হুযুরের কাছে নিয়ে আসলো, হুযূর ওর কাছ থেকে মোশকটা নিয়ে সেটার উপর তাঁর রহমতের হাতটা বুলায়ে ওটার মুখ খুলে দিলেন এবং ফরমাালেন, এখন তোমরা যে রকম তৃষ্ণান্ত হওনা কেন, এসো পানি পান করে নিজেদের তৃষ্ণা নিবারণ কর। কাফেলার সবাই সেই মোশক থেকে প্রবাহিত রহমতের ঝর্ণা থেকে পানি পান করতে শুরু করলেন এবং সবাই নিজ নিজ পাত্রও ভরে নিতে লাগলেন। এভাবে সবাই তৃপ্ত হলেন এবং সবাই পাত্রও ভরে নিলেন। হুযূরের এ মুজিজা দেখে সেই হাবশী গোলাম ভীষণ আশ্চর্য হলে গেল এবং হুযুরের হাত মোবারকে চুমু দিতে লাগলো। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) তাঁর নুরানী হাত ওর মুখের উপর বুলায়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই হাবশীর কাল রং উজ্জ্বল সাদা রং এ রূপান্তরিত হয়ে গেল। অতঃপর সেই হবশী কলেমা পড়ে নিজের অন্তরকেও আলোকিত করে নিল।

মুসলামান হয়ে সে যখন স্বীয় মুনিবের কাছে ফিরে গেল, তখন মুনিব জিজ্ঞেস করলো তুমি কে? সে বললো, আপনার গোলাম। মুনিব বললো, তুমি, মিথ্যা বলছ, আমার গোলামের গায়ের রং তো কালো। সে বললো, আপনার কথা ঠিক। কিন্তু আমি সেই নূরের উৎস বরকতময় সত্ত্বা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এর সাথে দেখা করে তাঁর উপর ঈমান এনে এসেছি। যিনি সমগ্র সৃষ্টিকূল আলোকিত করেদিয়েছেন। সমস্ত কাহিনী শুনে, মুনিবও মুসলমান হয়ে গেল। (মছনবী শরীফ)।

সবক: আমাদের হুযূর আল্লাহর অনুমতিতে উভয় জাহানের কল্যাণকারী এবং মছিবতের সময় সাহায্যকারী। এরপরও যদি কেউ এ রকম বলে যে, হুযূর কারো সাহায্য করতে পারেন না এবং কারো ফরিয়াদ শুনেন না, তাহলে সে মস্তবড় জাহিল ও অজ্ঞ।



কাহিনী নং-১৮
মেঘমালার উপর কর্তৃত্ব—
মদীনা মনোয়ারায় একবার বৃষ্টি না হওয়ায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়ে ছিল। লোকেরা খুবই চিন্তিত হলো। এক জুমাবারে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, এক বেদুইন দাঁড়িয়ে আরয করলো, ইয়া রসুলল্লাহ! ক্ষেত খামার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সন্তান-সন্ততি উপবাস থাকছে। আপনি দুআ করুন, যেন বৃষ্টি হয়। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর প্রিয় নুরানী হাত মুবারক উঠালেন (বর্ণনাকারীর বক্তব্য) আসমান তখন একেবারে পরিষ্কার ছিল। মেঘের কোন নাম নিশানা ছিল না।কিন্তু মদনী সরকারের হাত মুবারক উঠানো মাত্রই পাহাড়ের মত মেঘে ছেয়ে গেল। দেখতে দেখতে বৃষ্টি পড়তে লাগলো। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তখনও মিম্বরে ছিলেন, ছাদ টপকিয়ে পানি পড়তে ছিল এবং হুযূরের দাঁড়ি মুবারক থেকে পানির ফোঁটা নিচে পড়তে ছিল। এ বৃষ্টি আর বন্ধ হয় না। পরবর্তী জুমার দিন হুযূর যখন খুতবা দিতে উঠলেন, তখন সেই বেদুইন, যে এর আগের জুমায় বৃষ্টি না হওয়ার কারণে কষ্টের কথা আরয করেছিল, দাঁড়িয়ে আরয করলো, ইয়া রসুলল্লাহ! এখনতো ক্ষেত-খামার ডুবে যাচ্ছে, ঘরবাড়ী পড়ে যাচ্ছে। আপনি দুআ করুন যেন বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তখন তাঁর প্রিয় নুরানী হাত মুবারক উঠালেন এবং স্বীয় আঙ্গুলী মুবারক দ্বারা ইশারা করে দুআ করলেন, হে আল্লাহ! আমাদের আশে পাশে বৃষ্টি হোক কিন্তু আমাদের উপর বৃষ্টি পতিত না হোক, হুযুরের ইশারা করা মাত্রই যে দিকে হুযুরের আঙ্গুলী মুবারক গেছে সেদিকে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে এবং মদীনা মনোয়ারার উপরস্থ আসমান পরিস্কার হয়ে গেল। (মিশকাত শরীফ ৫২৮ পৃঃ)

সবক : সাহাবায়ে কিরাম যে কোন বিপদের সময় হুযূরের বারগাহে ফরিয়াদ নিয়ে আসতেন। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এখানে সব সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়। এখনও আমরা হুযূরের মুখাপেক্ষী, হুযুরের ওসীলা ব্যতীত আমরা আল্লাহ থেকে কিছুই পেতে পারি না। মেঘমালার উপরও হুযূরের কর্তৃত্ব রয়েছে।

কাহিনী নং - ১৯
চাঁদের উপর কর্তৃত্ব—
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর শত্রুরা বিশেষ করে আবু জেহেল একবার হুযূরকে বললো, তুমি যদি সত্যই আল্লাহর রসুল হও, তাহলে আসমানের চাঁদকে দু' টুকরা করে দেখাও দেখি। হুযূর ফরমালেন, ঠিক আছে, এটাও করে দেখাচ্ছি। এ বলে তিনি যখন চাঁদের দিকে স্বীয় আঙ্গুল মুবারক দ্বারা ইশারা করলেন তখন চাঁদ দু'টুকরা হয়ে গেল। এটা দেখে আবু জেহেল আশ্চর্যন্বিত হয়ে গেল। কিন্তু বেঈমান তবুও এটা মেনে নিল না বরং হুযূরকে যাদুকর বলতে লাগলো, (বোখারী শরীফ ২৭১২ পৃঃ ২ জি %)।

সবক: আমাদের হুযুরের হুকুমত চাঁদের উপরও চলে। এত বড় ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বে বেঈমান লোকেরা হুযুরের এখতিয়ার ও কর্তৃত্বকে মানে না।

কাহিনী নং - ২০
সূর্যের উপর কর্তৃত্ব—
একদিন মকামে সুহবায় হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জোহরের নামায আদায় করলেন। অতঃপর হযরত আলী (রাদিআল্লাহ আনহু)-কে কোন এক কাজের জন্য বাইরে পাঠালেন। হযরত আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) ফিরে আসার আগে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আসরের নামাযও পড়ে নিলেন। হযরত আলী যখন ফিরে আসলেন, তখন তাঁর কোলে পবিত্র মস্তক মুবারক রেখে হুযূর শুয়ে গেলেন, হযরত আলী কিন্তু তখনও আসরের নামায আদায় করেননি। এদিকে সূর্য ডুবন্ত অবস্থায় ছিল। হযরত আলী চিন্তা করতে লাগলেন যে, এদিকে রসূলে খোদা আরাম করছেন ওদিকে নামাযের ওয়াক্ত চলে যাচ্ছে। রসূলে খোদার আরামকে যদি প্রাধান্য দি, তাহলে নামাযের সময় চলে যায় আর নামায পড়তে চাইলে হুযূরের আরামের ব্যাঘাত হয়, কি করা যায়? শেষ পর্যন্ত মওলা আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) এ সিদ্ধান্ত নিলেন যে নামায কাযা হোক কিন্তু হুযূরের ঘুমের ব্যাঘাত না হওয়া চায়। এ অবস্থায় সূর্য ডুবে গেল, আসরের ওয়াক্তও শেষ হয়ে আসলো। হুয়ুর জাগ্রত হয়ে হযরত আলীকে চিন্তাযুক্ত দেখে এর কারণ জানতে চাইলেন। হযরত আলী আরয কররেন, ইয়া রসূলল্লাহ! আমি আপনার আরামের ব্যাঘাত না করার খাতিরে এখনও আসরের নামায আদায় করিনি, অথচ সূর্য ডুবে গেল। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন চিন্তা কিসের সূর্য এক্ষনি ফিরে আসতেছে এবং সেই জায়গায় এসে থামতেছে, যেখানে আসরের সময় হয়। অতঃপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দুআ করার সাথে সাথে ডুবন্ত সূর্য উঠে আসলো এবং পশ্চাৎ গমন করে ঐ জায়গায় এসে দাড়ালো, যেখানে আসরের সময় হয়। হযরত আলী উঠে আসরের নামায পড়ে নিলেন। এরপর সূর্য ডুবে গেল। (হুজ্জাতিল্লাহে আলাল আলামীন ৩১৮ পৃঃ)।

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর হুকুমত সূর্যের উপরও চলে। তিনি সৃষ্টিকূলের প্রতিটি অনু পরমানুর উপর কর্তৃত্বকারী। তাঁর মত কেউ হয়নি, হবে না, হতে পারে না।

কাহিনী নং - ২১
জমীনের উপর হুজুরের কর্তৃত্ব—
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন হযরত ছিদ্দিকে আকবর (রাদিআল্লাহু আনহু)-কে সাথে নিয়ে মক্কা শরীফ থেকে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হলেন, তখন মক্কার কোরাইশ ঘোষণা দিল যে, যে কেউ মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও ওনার সাথী ছিদ্দিকে আকবর (রাদিআল্লাহু আনহু) কে গ্রেপ্তার করে আনতে পারবে, ওকে একশটি উট পুরস্কার দেয়া হবে। সোরাকা বিন জাশম এ ঘোষনা শুনা মাত্র তারদ্রুত গামী ঘোড়া নিয়ে বের হয়ে পড়লো। ঘোড়ার উপর বসে সে দম্ভভরে বললো আমার এ তেজী ঘোড়া মুহাম্মদ ও আবু বকরের পিছু নিবে এবং এক্ষুনি ওদের দুজনকে ধরে নিয়ে আসবো। এ বলে সে ঘোড়াকে দ্রুত হাকালো এবং অল্পসময়ের মধ্যে হুযুরের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। ছিদ্দিকে আকবর যখন দেখলো যে, সোরাকা ঘোড়া হাকিয়ে ওনাদের পিছু পিছু আসতেছে এবং প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, তখন তিনি হুযূরের কাছে আরয করলেন, ইয়া রসুলল্লাহ! সোরাকা আমাদেরকে দেখে ফেলছে, ঐ দেখুন, সে আমাদের পিছু পিছু আসতেছে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, হে ছিদ্দিক, কোন চিন্তা করোনা আল্লাহ আমাদের সাথে আছে। এর মধ্যে সোরাকা একেবারে কাছে পৌঁছেগেল। তখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দুআ করলেন। দুআ করার সাথে সাথে জমীন সোরাকার ঘোড়াকে ধরে ফেললো, এর চার পা সমেত পেট পর্যন্ত জমীনে দেবে গেল। সোরাকা এ দৃশ্য দেখে ঘাবড়িয়ে গেল এবং আরয করতে লাগলো, হে মুহাম্মদ! আমাকে ও আমার ঘোড়াকে এ মছিবত থেকে নাজাত দিন। আমি আপনার সাথে ওয়াদা করছি যে আমি ফিরে যাব এবং অন্য যে কেউ আপনার সন্ধানে এদিকে আসতে লাগলে, ওকেও আমি ফিরায়ে নিয়ে যাব। কাউকে আপনার দিকে আসতে দেবনা। তখন হুযুরের নির্দেশে জমীন ওকে ছেড়ে দিল।

সবক: আমাদের হুযূরের হুকুম ও ফরমান জমীনের উপরও চলে। সৃষ্টিকুলের প্রতিটি জিনিস হুযুরের অধীন করে দেয়া হয়েছে। এরপরও যে ব্যক্তির নিজের বউও ওর অনুগামী নয়, সে যদি হুযুরের মত নিজেকে মনে করে, ওর মত কান্ডজ্ঞানহীন বেঅকুফ আর কে থাকতে পারে?

কাহিনী নং - ২২
বৃক্ষরাজির উপর কর্তৃত্ব—
একবার এক বেদুইন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর খেদমতে এসে বললো, হে মুহাম্মদ! তুমি যদি আল্লাহর রসুল হও, তাহলে কোন একটা নমুনা দেখাও। হুযূর ফরমালেন, ঠিক আছে, দেখ, ঐ যে সামনে যে গাছটা খাঁড়া আছে, ওটার কাছে গিয়ে এতটুকু বল যে তোমাকে আল্লাহর রসূল ডাকছেন। কথামত সেই বেদুইন গাছটির কাছে গিয়ে বললো, তোমাকে আল্লাহর রসূল ডাকছেন। বৃক্ষটি এ কথা শুনে ডানে-বামে সামনে পিছে হেলিয়ে দুলিয়ে মাটি থেকে শিকড় আলগা করে চলতে চলতে হুযূরের খেদমতে হাজির হয়ে গেল এবং আরয করলো আস্সালামু আলাইকুম ইয়া রসূলুল্লাহ! বেদুইন লোকটি হুযূরকে বলতে লাগলো, আপনি গাছটিকে স্বীয় জায়গায় চলে যাবার জন্য বলল। অতএব হুযূর যখন ফরমালেন, যাও, ফিরে চলে যাও। বৃক্ষটি একথা শুনে পিছনের দিকে ঘুরে গেল এবং স্বীয় জায়গায় গিয়ে পুনরায় আগের মত খাঁড়া হয়ে গেল।

বেদুইন লোকটি এ মুজিজা দেখে মুসলমান হয়ে গেল এবং হুযূরকে সিজদা করার অনুমতি চাইলো। হুযূর ফরমালেন সিজদা করা জাযেয় নেই। পুনরায় সে হুযূরের হাত পা মুবারকে চুমু দেয়ার অনুমতি চাইলো তখন হুযূর ফরমালেন, হ্যাঁ, এটা করতে পার। অতঃপর সে হুযুরের হাত-পা মুবারকে চুমু দিল। (হুজ্জাতুল্লাহে আলাল আলামীন ৪৪১ পৃঃ)।

সবক: আমাদের হুযুরের হুকুম বৃক্ষ রাজির উপরও চলে। উপরোক্ত কাহিনী থেকে এটাও বুঝা গেল যে, বুজুর্গানে কিরামের হাত পায় চুমু দেয়া জাযেয় আছে। কেননা হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এটা নিষেধ করেননি।

কাহিনী নং- ২৩
পাগলা উট—
বনী নজারের বাগানে এক পাগলা উট কোথা হতে এসে আশ্রয় নিল। বাগানে যে কেউ গেলে, সেই উট ওকে কামড় দেয়ার জন্য দৌড়ে আসতো। লোকেরা বড় সমস্যায় পড়লো এবং হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর খেদমতে এসে সমস্ত ঘটনা আরয করলো। হুযূর ফরমালেন, চলো, আমি যাচ্ছি-এ বলে হুযূর সেই বাগানে তশরীফ নিয়ে গেলেন এবং সেই উটকে বললেন, এদিকে এসো। উট রসুলল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নির্দেশ শুনা মাত্র দৌড়ে এসে হাজির হলো এবং হুযুরের কদম মোবারকের উপর মাথা রাখলো। হুযূর বললেন, এর নাফা (নাকের ভিতর যে রাশি পরানো হয়) নিয়ে এসো, নাফা আনা হলে হুযূর নিজেই নাফা পরায়ে এর মালিকের হাতে হস্তান্তর করলেন এবং উটটা মালিকের সাথে শান্তভাবে চলে গেল। অতঃপর হুযূর উপস্থিত সাহাবীগণকে ফরমালেন, কাফিরেরা ব্যতীত জমীন আসমানের অধিবাসী সবাই জানে যে আমি আল্লাহর রসূল। (হুজ্জাতুল্লাহে আলাল আলামীন ৪৫৮ পৃঃ)।

সবক: আমাদের হুযুরের নির্দেশ জীব জন্তুর উপরও চলে। একমাত্র কাফিরেরা ব্যতীত সৃষ্টিকূলের প্রতিটি বস্তু আমাদের হুযূরের রেসালত ও সত্যবাদিতা সম্পর্কে জ্ঞাত।

কাহিনী নং - ২৪
বায়তুল্লাহ শরীফের চাবি—
হিজরতের আগে বায়তুল্লাহ শরীফের চাবি মক্কার কোরাইশ গোত্রের অধীনে ছিল। উসমান বিন তলহার কাছে এ চাবি থাকতো। সোমবার ও বৃহস্পতিবার বায়তুল্লাহ শরীফ খোলা রাখতো। একদিন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এসে উসমান বিন তলহাকে দরজা খোলার জন্য বললেন, কিন্তু সে দরজা খুলতে অস্বীকার করলো। হুযূর ফরমালেন, হে উসমান, আজতো তুমি দরজা খুলতে অস্বীকার করছ, এমন এক দিন আসবে, তখন বায়তুল্লাহ শরীফের চাবি আমার কবজায় হবে, তখন আমি যাকে ইচ্ছে এ চাবি প্রদান করবো। উসমান বললো, সেই দিন কি কোরাইশ বংশের অস্তিত্ব থাকবে না? দেখা যাবে। অতঃপর হিজরতের পর যখন মক্কা বিজয় হলো এবং হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কিরামের বিশাল বাহিনী নিয়ে বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন সর্বপ্রথম বায়তুল্লাহ শরীফে তশরীফ নিয়ে গেলেন এবং চাবি রক্ষক উসমানকে ডেকে বললেন, চাবি আমাকে দিয়ে দাও। অগত্যা উসমানকে সেই চাবি দিয়ে দিতে হলো। হুযূর সেই চাবি হাতে নিয়ে উসমানকে লক্ষ্য করে বললেন, উসমান, লও, আমিও তোমাকে চাবিরক্ষক নিয়োজিত করছি, তোমার থেকে কোন জালিমই এই চাবি নিবে উসমান যখন পুনরায় চাবি গ্রহণ করলো তখন হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, হে উসমান, তোমার কি সেদিনের কথা স্মরণ আছে, যখন আমি তোমার থেকে চাবি চেয়েছিলাম এবং তুমি দরজা খুলতে অস্বীকার করেছিলে এবং আমি বলে ছিলাম এমন একদিন আসবে, তখন এ চাবি আমার কব্জায় হবে এবং আমি যাকে ইচ্ছে তাকে দিতে পারব। উসমান বললো, হ্যাঁ, হুযূর, আমার স্মরণ আছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর সত্যিকার রসূল। (হুজাতুল্লাহে আলল আলামীন ৪৯৯ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযূর আগে পরের সব বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত এবং কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে, সব তাঁর কাছে সুস্পষ্ট। আল্লাহ তাআলা তাঁকে অদৃশ্য জ্ঞান দান করেছেন। তিনি অদৃশ্য জ্ঞানী। যা কিছু হয়েছে ও হবে, সব বিষয়ে তিনি জ্ঞাত। অতএব যে ব্যক্তি 'বলে যে আগামীকাল কি হবে, তা হুযূর জানেন না, ওর থেকে বড় অথর্ব আর কে হতে পারে?

কাহিনী নং - ২৫
হারানো উষ্ট্রী—
তাবুকের যুদ্ধে হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর উষ্ট্রী হারিয়ে গিয়েছিল। এক মুনাফেক মুসলমানগণকে বললো, তোমাদের মুহাম্মদতো নবী দাবী করে এবং তোমাদেরকে আসমানের কথা শুনায়। অথচ তাঁর উষ্ট্রীর হদিস তাঁর কাছে নেই। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন মুনাফেকের এ কথা শুনলেন, তখন ফরমালেন নিশ্চয়ই আমি নবী এবং আল্লাহ আমাকে অদৃশ্য জ্ঞান দান করেছেন। শুন, আমার উস্ত্রী অমুক জায়গায় দাঁড়ানো আছে। এক বৃক্ষের সাথে ওর নাকের রশি আটকে গেছে। যাও ওখান থেকে উষ্ট্রীটি নিয়ে এসো। নির্দেশমত সাহাবায়ে কিরাম গিয়ে দেখলেন যে, ঠিকই উষ্ট্রীটি সেই জায়গায় দাঁড়ানো ছিল এবং ওটার নাকের রশিটি এক বৃক্ষের সাথে আটকে গিয়েছিল। (যাদুল মুয়াবেস ৩ পৃঃ ৩ জিঃ হুজ্জাতুল্লাহে আলাল আলামীন ৫১০ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযূরকে আল্লাহ তাআলা এতটুকু ইলমে গায়ব দান করেছেন যে, কোন বিষয় তাঁর কাছে লুকায়িত নেই। কিন্তু মুনাফেকরা তাঁর এ অদৃশ্য জ্ঞানকে অস্বীকার করে।

কাহিনী নং - ২৬
বন্দী চাচা—
বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা যখন মুসলমানগণকে জয়যুক্ত করলেন এবং কাফিরদেরকে পরাভূত করলেন, তখন মুসলমানগণের হাতে যারা বন্দী হয়েছিল, তাদের মধ্যে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর চাচা হযরত আব্বাস (রাদিআল্লাহ আনহু) ছিলেন। বন্দীদের থেকে যখন মুক্তিপণ দাবী করা হলো, তখন হযরত আব্বাস বললেন, হে মুহাম্মদ আমিতো গরীব, আমার কাছে তো কিছুই নেই। তুমি যখন আমাকে মক্কায় ত্যাগ করে চলে এসেছিলে তখন বংশের সবার থেকে আমি গরীব ছিলাম। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, তা ঠিক, তবে আপনি যখন কাফিরদের সাথে বদরের যুদ্ধে আসার মনস্থ করলেন, তখন আপনি চাচী-উন্মে ফজলকে গোপন ভাবে যে স্বর্ণের পাতগুলো দিয়ে এসেছেন, সেটা গোপন করছেন কেন? হযরত আব্বাস (রাদি আল্লাহ আনহু) এ কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং হুযুরের এ অদৃশ্য জ্ঞান দেখে মুসলমান হয়ে গেলেন। (দলায়েলে নবুয়াত ১৭১ পৃঃ ২ জিঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে কোন বিষয় গোপন নেই। আল্লাহ তাআলা হুযূরকে প্রত্যেক কিছুর জ্ঞান দান করেছেন। ইলমে গায়বও হুযুরের একটি মুজিজা যার উপর প্রত্যেক মুসলমানের ঈমান রয়েছে।

কাহিনী নং-২৭
কবুতরের বাচ্ছা—
এক বেদুইন তার কাপড়ের আস্তিত্বের ভিতরে কিছু লুকায়ে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর খেদমতে হাজির হলো এবং বললো, হে মুহাম্মদ! যদি তুমি বলতে পার যে আমার আস্তিনের ভিতরে কি আছে, তাহলে আমি স্বীকার করবো যে তুমি সত্যিকার নবী। 
হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, সত্যিই তুমি ঈমান আনবে? সে বললো হ্যাঁ, ঠিক! আমি ঈমান আনবো। হুযূর ফরমালেন, তাহলে, শুন, তুমি এক জংগল দিয়ে যাচ্ছিলে, পথের ধারে এক গাছ দেখলে, যেখানে কবুতরের বাসা ছিল। সেই বাসায় কবুতরের দুটি বাচ্ছা ছিল। তুমি বাচ্ছা দুটি ধরে যখন নিয়ে আসতে ছিলে, তখন স্ত্রী কবুতরটি তা দেখে তোমার উপর ঝাপিয়ে পড়ছিল তখন তুমি সেটাকেও ধরে ফেলেছ। এ মূহুর্তে সেই স্ত্রী কবুতর ও বাচ্ছাদ্বয় তোমার কাছে তোমার কাপড়ের আস্তিনের ভিতর লুকায়িত আছে।

বেদুইন একথা শুনে বিস্মিত হয়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘোষনা করলো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রসূল (জামেউল মুজিজাত ২১ পৃঃ)।

সবক: আমাদের হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে কিছু গোপন ছিল না। একজন অজ্ঞ বেদুইন এটা জানতো যে, যিনি নবী তিনি অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী হন। কিন্তু জ্ঞানী গুনীর দাবীদার হয়ে যে নবীর জ্ঞানকে অস্বীকার করে, ওর থেকে বড় মুর্খ ও কাণ্ডজ্ঞানহীন আর কেউ হতে পারে না।

কাহিনী নং-২৮
জান্নাতের উষ্ট্রী—
হযরত মওলা আলী (রাদি আল্লাহু আনহু) কোন একদিন বাহির থেকে ঘরে আসলে, হযরত ফাতিমা (রাদি আল্লাহু আনহু) বললেন, আমি এ সূতাগুলো কেটেছি। আপনি এগুলো বাজারে নিয়ে বিক্রি করে আটা কিনে আনুন, যেন হাসান-হোসাইনকে রুটি বানিয়ে খাওয়াতে পারি। হযরত আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) সূতা বাজারে নিয়ে গেলেন এবং ছয় টাকায় বিক্রি করলেন। অতঃপর সেই টাকা দিয়ে কিছু ক্রয় করার মনস্থ করলেন। ইত্যবসরে এক ভিক্ষুক হাঁক দিল, (যে আল্লাহকে উত্তম কর্জ প্রদান করে) হযরত আলী (রাদি আল্লাহু আনহু) সেই টাকা সেই ভিক্ষুককে দিয়ে দিলেন। এর কিছুক্ষণ পর এক বেদুইন আসলো, ওর কাছে এক বড় মোটা তাজা উষ্ট্রী ছিল। সে বললো, হে আলী, এ উষ্ট্রীটি ক্রয় করবেন। হযরত আলী (র.) বললেন, আমার কাছে টাকা পয়সা নেই। বেদুইন বললো বাকীতে নিয়ে নাও-এ বলে উষ্ট্রীর রশি ওনার হাতে দিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর অপর আর একজন বেদুইন উপস্থিত হয়ে বললো, হে আলী, এ উষ্ট্রী বিক্রি করবেন? হযরত আলী বললেন, নিয়ে নাও। নগদ তিনশ নিন-এ বলে তিনশ দিয়ে বেদুইন উষ্ট্রীটি নিয়ে চলে গেল। এরপর হযরত আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) প্রথম বেদুইনকে তালাশ করলেন কিন্তু পাওয়া গেলনা। অগত্যা ঘরে ফিরে আসলেন। ঘরে এসে দেখে যে হযরত ফাতিমা (রাদিআল্লাহু আনহা) এর পাশে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বসে আছেন। হযরত আলীকে দেখে মুচকি হেসে বললেন, আলী, উষ্ট্রীর কাহিনী তুমি নিজে শুনাবে, নাকি আমি শুনাবো? হযরত আলী আরয করলেন, হুযূর, আপনিই শুনান। 
হুযূর ফরমালেন, প্রথম বেদুইন ছিল জিব্রাইল এবং দ্বিতীয় বেদুইন ছিল ইস্রাফিল এবং উষ্ট্রীটি ছিল জান্নাতের, যেটার উপর জান্নাতে ফাতিমা (রাদিআল্লাহু আনহা) আরোহন করবেন। আল্লাহর কাছে তোমার দান সেই ছয় টাকা যা ভিক্ষুককে দিয়েছ, খুবই পছন্দ হয়েছে এবং আল্লাহ তাআলা তোমাকে দুনিয়াতে উষ্ট্রীর ক্রয় বিক্রয়ের বাহানায় এর প্রতিদান দিয়েছেন। (জামেউল মুজিজাত ৪ পৃঃ)

সবক : আল্লাহ ওয়ালা নিজে উপবাস রয়ে অভাবীদেরকে খাওয়ান। এ কাহিনী থেকে এটাও বুঝা গেল যে আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অদৃশ্য জ্ঞানী, তাঁর কাছে কোন কিছু লুকায়িত নেই।

কাহিনী নং-২৯
বনের হরিণী
এক জংগলে এক হরিনী বাস করতো, ওর দুটি বাচ্ছা ছিল। একবার সে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়ে রাস্তার ধারে শিকারীর পাতানো জালে আটকে যায়। তখন সে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লো। ওর সুভাগ্য দেখুন, হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সেই জংগল দিয়ে যাবার সময় ওর নজরে পড়লো। সে হুয়ূরকে দেখার সাথে সাথে ডাক দিয়ে উঠলো, ইয়া রসুলল্লাহ! আমার প্রতি দয়া করুন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ওর ডাক শুনে ওর কাছে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি সমস্যা? সে বললো, হুযূর আমি এ বেদুইনের জালে আটকে গেছি। আমার দুটি ছোট ছোট বাচ্ছা রয়েছে, এ পাহাড়ের কাছেই আছে। আপনি কিছুক্ষণের জন্য আমার জিম্মাদার হয়ে আমাকে ছেড়ে দিন যেন আমি শেষ বারের মত আমার বাচ্চাদেরকে দুধ পান করাতে পারি। হুযুর, আমি দুধ পান করায়ে ফিরে আসবো। হুযূর ফরমালেন, ঠিক আছে, আমি, জিম্মাদার হয়ে তোমাকে ছেড়ে দিলাম এবং তোমার জন্য এখানে অপেক্ষা করতেছি। তুমি বাচ্চাদের দুধ পান করায়ে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।

শিকারী বেদুইনটি মুসলমান ছিল না। সে বলতে লাগলো, আমার শিকার ফিরে না আসলে খুবই খারাপ হবে। হুযূর ফরমালেন, প্রথমে দেখ হরিণী ফিরে আসতেছে কিনা। হারিণী কথামত বাচ্চাদের কাছে গিয়ে দুধ পান করায়ে যথাসময়ে ফিরে আসলো এবং কৃতজ্ঞতা স্বরূপ হুযুরের কদমদ্বয়ের উপর মাথা রাখলো। এ দৃশ্য দেখে বেদুইন স্থির থাকতে পারলোনা, সেও কদম মুবারকে ঝুকে পড়লো। হুযূর উভয়ের মাথার উপর রহমনের হাত মুবারক বুলায়ে ফরমালেন ওহে হরিনী, তুমি জানে বেঁচে গেছ আর হে কাফির শিকারী, তুমি দোযখের আযাব থেকে মুক্তি পেয়ে গেছ। (শিফা শরীফ ৭৬ পৃঃ ২ জিঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জীব জন্তুদের জন্য রহমত এবং জীব জন্তুরাও হুযুরের হুকুম মান্য করে। কিন্তু ইনসান হয়ে যারা হুযুরের হুকুম মান্য করে না, তারা পশুর থেকেও অধম।

কাহিনী নং - ৩০
এক বিধর্মিনীর ঘর—
হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মক্কা বিজয়ের পর মক্কা মুয়াজ্জমার এক বিধর্মী মহিলার ঘরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে তাঁর কোন এক খাদিমের সাথে কথা বলছিলেন। সেই বিধর্মী মহিলা যখন জানতে পারলো যে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ওর ঘরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছেন, তখন সে হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে ঘরের সব জানালা বন্ধ করে দিল, যেন সে হুযূরের কণ্ঠস্বর শুনতে না পায়। সেই মূহুর্তে জিব্রাঈল আমীন উপস্থিত হয়ে আরয করলেনঃ ইয়া রসুলল্লাহ! আল্লাহ তাআলা ফরমান, যদিওবা এ মহিলা অমুসলিম কিন্তু আপনার শানমান বড় মহৎ, অনেক উচ্চ। যেহেতু এ অমুসলিম মহিলার দেয়ালের সাথে আপনার পিঠ মুবারক লেগেছে, সেহেতু আমি চাই না যে এ গৃহিনী জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হোক। এ মহিলাতো স্বীয় ঘরের জানালাসমূহ বন্ধ করেছে কিন্তু আমি ওর অন্তরের জানালা খুলে দিয়েছি এবং এটা ওর দেয়ালে আপনার ঠেস দিয়ে দাঁড়ানোর বরকতেরই ফল। ইত্যবসরে সেই মহিলা অস্থির হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসলো এবং চিৎকার করে বললো আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রসূল। (নজহাতুল মাজালেস ৭৮ পৃঃ ২ জিঃ)

সবকঃ অমুসলিম মহিলার ঘরের দেয়ালের সাথে হুযূরের পিঠ মুবারক লাগার কারণে সে দোযখের আগুন থেকে বেঁচে গেল। তাহলে যেই ভাগ্যবতী পরিত্র মহিলা হযরত আমেনা (রাদি আল্লাহু আনহা) এর গর্ভে হুযূর অবস্থান করেছেন, সেই পবিত্র মহিলা কেন জান্নাতের অধিবাসী হবেন না। ওরা কত বড় বদবর্য্য, যারা হুযূরের মা-বাপ সম্পর্কে যা-তা বলে।

কাহিনী নং-৩১
দুগ্ধপোষ্য শিশুর সত্যবানী ঘোষণা—
হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একবার সাহাবায়ে কিরামের সমাবেশে তশরীফ রেখেছিলেন। এমন সময় এক বিধর্মী মহিলা তার দুমাস বয়স্ক দুগ্ধ পোষ্য শিশুকে কোলে নিয়ে সেই দিক দিয়ে যাচ্ছিল। শিশুটি যখন হুযূরকে দেখলেন তখন একেবারে সুস্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠলেন: "হে আল্লাহর রসূল হে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানিত মখলুক! আপনার প্রতি সালাম"।

মা তার দু'মাস বয়স্ক শিশুকে কথা বলতে দেখে বিস্মিত হয়ে গেল এবং শিশুকে জিজ্ঞেস করলো, বেটা তোকে এ কথা কে শিখিয়ে দিয়েছে? আর ইনি যে আল্লাহর রসুল তা তোকে কে বলে দিয়েছে? শিশু এবার মাকে সম্বোধন করে বলতে লাগলো, হে মা। এ কথা আমাকে সেই আল্লাহ শিখিয়েছেন, যিনি সকল মানুষকে এ ধরণের কথা বলার শক্তি দিয়েছেন এবং এ দেখুন আমার মাথার উপর জিব্রাইল দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি আমাকে বলছেন যে ইনি আল্লাহর রসূল। মা এ অলৌকিক ঘটনা দেখে সংগে সংগে কালেমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেল। মাওলানা রুমী (রহমতুল্লাহে আলাইহি) মছনবী শরীফে লিখেছেন, হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শিশুকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন। তোমার নাম কি? তখন শিশুটি বললো: "ইয়া রসুলল্লাহ! এক মুষ্ঠি মাটির তৈরী এ বান্দার নাম আমার মায়ের কাছে আবদে উয্যা কিন্তু আল্লাহর কাছে আবদুল আযিয। (নাযহাতুল মাজালিস ৭২ পৃঃ ২জিঃ)

সবক: দু এক মাসের শিশুও হুযূরকে চিনে ও মান্য করে এবং নিজের মাকেও জান্নাতে নিয়ে যায়। কিন্তু আফসোস! ঐসব বয়স্ক বদবখতের জন্য যারা হুযূরকে চিনলো না ও মান্যও করলো না, স্বীয় গুমরাহী ও বেআদবী দ্বারা নিজেও ডুবলো এবং অন্যদেরকেও ডুবালো।

কাহিনী নং- ৩২
রাতের চোর—
একবার হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আবু হোরাইরা (রাদিআল্লাহু আনহু) কে সদকায়ে ফিতরের মালামাল হেফাজতের জন্য নিয়োজিত করেছিলেন। হযরত আবু হোরাইরা দিনরাত সেই মালের হেফাজত করতে লাগলেন। এক রাতে এক চোর এসে মাল চুরি করতেছিল। হযরত আবু হোরাইরা ওকে দেখে ফেলেন এবং ধরে ফেলেন এবং বলেন আমি তোকে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর খেদমতে হাজির করবো। চোর কাকুতি মিনতি করে বললো, আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ছেড়ে দিন। আমার পরিবার পরিজন আছে। আমি খুবই অভাবী। একথা শুনে হয়রত আবু হোরাইরার দয়া হলো এবং ওকে ছেড়ে দিলেন। সকালে আবু হোরাইরা যখন বারগাহে রেসালতে হাজির হলেন, তখন হুযূর মুচকি হেসে বললেন, আবু হোরাইরা, তোমার রাতের কয়েদী (চোর) কি বললো? আবু হোরাইরা আরষ করলেন, হুযূর সে স্বীয় পরিবার পরিজন ও অভাব অনটনের কথা বলায় আমার দয়া হলো। তাই ছেড়ে দিয়েছি। হুযূর ফরমালেন, সে মিথ্যা বলেছে। সাবধান থেকো, আজ রাতও সে পুনরায় আসবে। হযরত আবু হোরাইরা বলেন, দ্বিতীয় রাতও আমি ওর অপেক্ষায় রইলাম। দেখতে দেখতে ঠিকই সে আসলো এবং মাল চুরি করেতে শুরু করলো। আমি পুনরায় ওকে ধরে ফেললাম। এবারও সে কাকুতি মিনতি করতে লাগলো। আমারও দয়া হলো, তাই আবার ছেড়ে দিলাম। সকালে হুযুরের বারগাহে হাজির হলে হুযূর পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার রাতের কয়েদী (চোর) কি বললো? আমি আরয করলাম, হুযূর! সে আজও তার অভাব অনটনের কথা বলেছে। তাই আমার দয়া হওয়ায় আজও ওকে ছেড়ে দিয়েছি। হুযূর ফরমালেন, সে তোমার কাছে মিথ্যা বলেছে। সাবধান! সে আজও আসবে। হযরত আবু হোরাইরা বলেন, তৃতীয় রাত সে আবার আসলো এবং আমি ওকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, কমবখত! আজ তোকে আর ছাড়বো না, হুযুরের কাছে নিয়ে যাব। সে বললো, জনাব আবু হোরাইরা, আমি আপনাকে কয়েকটি দুআ শিখায়ে যেতে চাই, সেটা পাঠ করার দ্বারা আপনার উপকার হবে। শুনেন, যখন শুইতে যাবেন তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করে শুইবেন। এর দ্বারা আল্লাহ আপনার হেফাজত করবেন এবং শয়তান আপনার কাছে আসতে পারবে না। হযরত আবু হোরাইরা বলেন, সে আমাকে এ বাক্যগুলো শিখায়ে এবারও আমার থেকে রেহাই পেয়ে গেল। সকালে আমি যখন হুযুরের দরবারে পুরা কাহিনী বর্ণনা করলাম, তখন হুযূর ফরমালেন, সে এ কথাটি সত্য বলেছে অথচ সে বড় মিথ্যুক। তুমি কি জান হে আবু হোরাইরা!এ তিনরাতের চোরটা কে? আমি আরয করলাম, জ্বিনা, ইয়া রসুলল্লাহ! আমি জানিনা। হুযূর ফরমালেন, সে ছিল শয়তান। (মিশকাত-১৭৭ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিগত ও ভবিষ্যতের সব ঘটনাবলী জানেন। হযরত আবু হোরাইরার কাছে রাতে চোর আসলো, কিন্তু সকালে হুযূর নিজেই বললেন, আবু হোরাইরা! রাতের কয়েদী কি বললো? এটাও বলেছেন, আজ পুনরায় আসবে। ঠিকই তাই হয়েছিল। এতে বুঝা গেল, হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) যা হয়েছে এবং যা হবে, সব বিষয়ে জ্ঞাত।

কাহিনী নং - ৩৩
নেকড়ে বাঘের সাক্ষ্য—
মদীনা মনোয়ারার কোন এক পাহাড়ী এলাকায় এক রাখাল ছাগল চড়াতে ছিল। হঠাৎ একটি নেকড়ে বাঘ এসে ছাগলের পালের ভিতর ঢুকে একটি ছাগল নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। রাখাল ধাওয়া করে বাঘ থেকে ছাগলটি উদ্ধার করলো। বাঘ যখন দেখলো যে ওর শিকারটা কেড়ে নিয়ে নিল, তখন এক টিলার উপর উঠে সুস্পস্ট ভাষায় বলতে লাগলো, ওহে রাখাল! আল্লাহ আমাকে রিজিক দিয়েছিল কিন্তু আফসোস! তুমি তা আমার থেকে ছিনিয়ে নিলে। রাখাল বাঘকে কথা বলতে দেখে বিস্মিত হয়ে বললো আশ্চার্য ব্যাপার! বাঘও কথা বলে! বাঘ পুনরায় বললো, এর থেকে অধিক আশ্চর্যের বিষয় হলো যে মদীনা শরীফে এমন এক মহান ব্যক্তি রয়েছেন যিনি তোমাদেরকে যা কিছু হয়েছে এবং যা কিছু হবে মোট কথা আগে পরের সব বিষয়ের খবর দেন কিন্তু তোমরা উনার প্রতি ঈমান আননা। রাখাল লোকটি ইহুদী ছিল। বাঘের মুখে এ সাক্ষ্য শুনে খুবই প্রভাবিত হলো এবং হুযূরের বারগাহে হাজির হয়ে মুসলমান হয়ে গেল (মিশকাত শরীফ ৫৩৩ পৃঃ)।

সবক : একটি পশুও জানে ও মানে যে, হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিগত ও ভবিষ্যতের বিষয় জানেন কিন্তু মানুষ নামধারী এমন জানেয়ারও আছে, যে (মাযাল্লা) হুযুরের বেলায় দেয়ালের পিছনের জ্ঞানও স্বীকার করে না।

কাহিনী নং- ৩৪
নেক আক্বীদাবান গাধা—
খায়বর যুদ্ধ জয়ের পর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফিরে আসছিলেন। পথে তাঁর খেদমতে এক গাধা উপস্থিত হয়ে আরয করতে লাগলো, হুযূর! আমার আবেদনটি মেহেরবাণী করে শুনে যান। রহমতে আলম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ অসহায় পশুর নিবেদন শুনার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন এবং ফরমালেন, কি বলতে চাও, বল। 
গাধা বললো, হুযূর আমার নাম ইয়াযিদ বিন শাহাব। আমার পূর্ব পুরুষের বংশে আল্লাহ তাআলা ষাটটি গাধা পয়দা করেছিল। ও গুলোর উপর আল্লাহর নবীগণ আরোহন করেছেন। হুযূর, আমার আন্তরিক বাসনা হলো আপনিও যেন আমার উপর আরোহন করেন, ইয়া রসুলল্লাহ! আমি এ কথা বলার হকদারও বটে। কেননা আমার বংশের মধ্যে এখন আমি ছাড়া আর কেউ নেই এবং আল্লাহর রসুলের মধ্যেও এখন আপনি ছাড়া আর কেউ নেই। হুযূর গাধার এ মনোবাসনা শুনে ফরমালেন, ঠিক আছে, আমি তোমাকে আমার বাহন হিসেবে গ্রহণ করলাম এবং তোমার নামের পরিবর্তন করে ইয়াফুর রাখলাম। (হুজ্জাতুল্লাহে আলাল আলামীন ৪৬০ পৃঃ)

সবক : একটি গাধাও হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর খতমে নাবুয়াতের কথা স্বীকার করে। কিন্তু মানুষ হয়ে যে খতমে নবুয়াত স্বীকার করে না, সে গাধা থেকেও অধম।

কাহিনী নং - ৩৫
হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) ও মলকুল মউত—
হুযূর সরওয়ারে আলম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর যখন রেছাল শরীফের সময় হলো, তখন মৃত্যুর ফিরিশতা হযরত জিব্রাইলকে সাথে নিয়ে হাজির হলো। হযরত জিব্রাইল আমীন আরয করলেন, ইয়া রসুলল্লাহ! মৃত্যুর ফিরিশতা এসেছে এবং আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছে। হুযূর, সে আজ পর্যন্ত কোন সময় কারো থেকে অনুমতি নেয়নি এবং আপনার পরেও কারো থেকে অনুমতি নেবে না। আরও বললেন, হুযূর! আপনি অনুমতি দিলে, সে স্বীয় কর্তব্য পালন করতে পারে। 
হুযূর। ফরমালেন, মৃত্যুর ফিরিশতাকে সামনে আসতে বল। অতঃপর মৃত্যুর ফিরিশতা সামনে এগিয়ে এলেন এবং আরয করলেন, ইয়া রসুলল্লাহ! আল্লাহ তাআলা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন এবং আমাকে এটা বলে দিয়েছেন যে আপনার প্রতিটি নির্দেশ যেন পালন করি এবং আপনি যা বলবেন, তাই করবো। অতএব আপনি যদি বলেন, তাহলে রূহ কবজ করবো অন্যথায় ফিরে যাব। হযরত জিব্রাইল আরয করলেন, হুযূর! আল্লাহ তাআলা আপনার বেছাল কাম্য করছেন। তখন হুযূর মৃত্যুর ফিরিশতাকে বললেন, হে মালাকুল মউত! তোমাকে জান কবজ করার অনুমতি দিলাম। জিব্রাইল বললেন, হুযূর, পৃথিবীতে আমির আগমন বন্ধ হয়ে গেল। পৃথিবীতে এটা আমার শেষ আগমন। কেননা আপনার জন্যইতো পৃথিবীতে আমার আগমন। এরপরে মৃত্যুর ফিরিশতা রূহ মুবারক কবজ করে ধন্য হলো। মওয়াহেবে লদুনিয়া ৪৭১ পৃঃ মিশকাত ৫৪১ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর এত বড় শান যে সেই মৃত্যুর ফিরিশতা, যিনি রাজা বাদশাহ কারো থেকে অনুমতি নেয় না। হুযূরের খেদমতে হাজির হয়ে অনুমতি প্রার্থনা করেন এবং এ রকম বলেন, যদি আপনি অনুমতি দেন, তাহলে জান কবজ করবো অন্যথায় ফিরে যাব। আল্লাহ তাআলা ওকে এ হুকুম দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, আমার মাহবুবের আনুগত্য কর। তিনি যা বলেন, তাই কর। হুযূরকে যারা নিজেদের মত বলে, ওরা কত বড় গুমরাহ। ওদের কাছে কি আজরাইল কোন সময় অনুমতি চেয়েছিলেন?

কাহিনী নং - ৩৬
শাহী সংবর্ধনা—
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর বেছাল শরীফের সময় জিব্রাইল আমীন উপস্থিত হলেন এবং আরয করতে লাগলেন, ইয়া রসুলল্লাহ! আজ আসমানসমূহে আপনার সংবর্ধনার প্রস্তুতি চলছে। আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের দারোগা হযরত মালেককে এ বলে নির্দেশ দিয়েছেন-মালেক! আমার হাবীবের রূহ মুবারক আসমানে তশরীফ আনতেছে। এ উপলক্ষে আজ দোযখের আগুন নিভায়ে দাও। জান্নাতের হুরদেরকে বললেন, তোমরা নিজেদের সাজসজ্জা কর এবং সমস্ত ফিরিশতাগণকে নির্দেশ দিলেন, মুস্তাফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর রূহ মুবারকের সম্মানের জন্য সবাই কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে যাও। আর আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, আমি যেন আপনার খেদমতে হাজির হয়ে আপনাকে এ সুখবর প্রদান করি যে, যতক্ষণ আপনি ও আপনার উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবেন না, ততক্ষণ সমস্ত নবী ও ওনাদের উম্মতগণের জন্য জান্নাত নিষিদ্ধ থাকবে এবং কাল কিয়ামতে আল্লাহ তাআলা আপনার উসীলায় আপনার উম্মতের উপর বখশীশ ও ক্ষমার এমন বারিধারা বর্ষন করবেন যে এতে আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। (মুদারেজুন নবুয়াত ২৫৪ পৃঃ ২ জিঃ)

সবক: আমাদের হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর শানমান উভয় জগতে রয়েছে। জ্বীন, মানুষ, হুর, ফিরিশতা সবাই হুযুরের খাদেম ও বাহিনী। তিনি উভয় জাহানের বাদশাহ।

কাহিনী নং-৩৭
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর গোসল মুবারক—
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর গোসল মুবারকের সময় সাহাবায়ে কিরাম চিন্তা করতে লাগলেন এবং পরস্পর আলোচনা করতে লাগলেন যে, যেভাবে অন্য লোকদের কাপড় খুলে গোসল দেয়া হয়, হুযূরকে কি সেভাবে কাপড় মুবারক খুলে গোসল দেয়া হবে, নাকি কাপড়সহ গোসল দেয়া হবে। এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল। হঠাৎ সবের উপর ঘুমের আবির্ভাব হলো এবং সবের মাথা বুকের উপর ঝুকে পড়লো। অতপর সবার কানে একটি আওয়াজ আসলো, কোন একজন বলছিল, তোমরা জাননা? ইনি কে? সাবধান! ইনি আল্লাহর রসুল। ওনার কাপড় খুলবে না, ওনাকে কাপড় সমেত গোসল দাও। অতঃপর সবার চোখ খুলে গেল এবং হুযূরকে কাপড় সমেত গোসল দেয়া হলো। (মওয়াহেবে লদুনিয়া ৩৭৮ পৃঃ ২ জিঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর শান সবার থেকে আলাদা ও বৈশিষ্ট্যময়। তাঁর অনুরূপ কোন ব্যক্তি হতে পারে না। তাঁর জিন্দেগী, বেছাল শরীফ, গোসল শরীফ, তাঁর রওজা মুবারকের শান, মোট কথা তাঁর প্রতিটি বিষয় বৈশিষ্ট্যময়। কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে তাঁর অনুরূপ হতে পারে না।

কাহিনী নং-৩৮
রওজা মুবারক থেকে আওয়াজ—
হযরত আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর দাফনের তিন দিন পর এক বেদুইন রওজা মুবারকে হাজির হয়ে রওজাার সামনে পতিত হয়ে রওজা শরীফের মাটি স্বীয় মাথায় দিতে লাগলো এবং বলতে লাগলো, ইয়া রসুলল্লাহ! আপনি যা কিছু বলেছেন, তা আমরা শুনেছি। আপনার মুখে আমরা যারা নিজেদের নফসের প্রতি জুলুম করে আপনার সমীপে হাজির হয়। অতএব হে আল্লাহ রসূল! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি এবং এখন গুনাহ মাফের জন্য আপনার সমীপে হাজির হয়েছি। বেদুইন এ কথা বলার সাথে সাথে রওজা মুবারক থেকে আওয়াজ আসলো, যাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। (হুজাতুল্লাহে আলাল আলামীন ৭৭৭ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর রহমতের দরবার বেছাল শরীফের পরও যথারীতি চালু রয়েছে। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় বেছালের পরও গুনাহগারদের জন্য নাজাতের উসীলা এবং ফয়েজ ও বরকতের উৎস হিসেবে বিদ্যমান। এখনও আমরা হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর মুখাপেক্ষী।

কাহিনী নং-৩৯
রওজা মুবারক থেকে আযানের আওয়াজ—
যে সময় ইয়াজিদ বাহিনী মদীনা মনোয়ারা আক্রমন করেছিল, সে সময় তিন দিন মসজিদে নববীতে আযান হতে পারেনি। হযরত সাঈদ বিন মুসাইব (রাদিআল্লাহু আনহু) এ তিন দিন মসজিদে নববীতে ছিলেন। তিনি বলেন, নামাযের ওয়াক্ত কখন হতো তা জানার কোন সুযোগ আমার ছিল না। তবে যখন নামাযের সময় হতো তখন রওজা মুবারক থেকে আযানের মৃদু আওয়াজ ভেসে আসতো। (মিশকাত শরীফ ৫৩৭ পৃঃ)

সবক : আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রওজা মুবারকে জীবিত আছেন, যারা (মাযাল্লা) বলে যে হুযুর মরে মাটির সাথে মিশে গেছেন, তারা বড় জাহেল ও রসূলের সাথে বেয়াদবীকারী।

কাহিনী নং-৪০
আসমানের কান্না—
মদীনা মনোয়ারায় এক বার দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। বৃষ্টি মোটেই হচ্ছিলনা। জনসাধারন উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রাদিআল্লাহু আনহা) এর খেদমতে ফরিয়াদ নিয়ে হাজির হলো। হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রাদিআল্লাহু আনহা) ফরমালেন, হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর রওজা পাকের ছাদে একটি ছিদ্র করে দাও, যেন আসমান ও রওজা পাকের মাঝখানে কোন কিছু আড়াল হয়ে না থাকে। 
পরামর্শ মুতাবেক লোকেরা তাই করলো। তখন এমন বৃষ্টি হলো যে ক্ষেতসমূহ শষ্য শ্যামল হয়ে গেল, পশু পাখী মোটা তাজা হয়ে গেল। মুহাদ্দেসীনে কিরাম বলেন যে, আসমান যখন নুরানী কবর দেখলো, তখন কেঁদে দিয়েছিল। (মিশকাত শরীফ ৫২৭ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর ফয়েজ বেছালের পরও যথাযত জারী আছে। হুযুরের রওজা পাক জেয়ারতের দ্বারা প্রত্যেকের চক্ষু অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে যায়, আল্লাহ থেকে কিছু পাওয়ার জন্য হুযুরের উসীলা প্রয়োজন।

কাহিনী নং-৪১
হযরত বেলালের স্বপ্ন—
হযরত ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু) এর খেলাফত কালে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। হযরত বেলাল বিন হারেছ (রাদিআল্লাহু আনহু) রওজা পাকে হাজির হয়ে আরয করলেন, ইয়া রসূলুল্লাহ! আপনার উম্মত বৃষ্টির অভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ওনাকে স্বপ্নে দেখা দিলেন এবং ফরমালেন, হে বেলাল! ওমরের কাছে যাও। ওকে আমার সালাম দিও এবং বলিও বৃষ্টি হবে। ওমরকে এটাও বলিও যেন কিছুটা নমনীয়তা গ্রহণ করে (এটা হুযূর এ জন্য বলেছেন যে হযরত ওমর ফারুক (রাদিআল্লাহু আনহু) দীনের ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিলেন।) 
হযরত বেলাল স্বপ্নে প্রাপ্ত নির্দেশ মুতাবেক হযরত ওমরের খেদমতে হাজির হলেন এবং হুযুরের সালাম ও পয়গাম পৌঁছালেন। হযরত ওমর এ সালাম ও পয়গাম পেয়ে খুবই কান্নাকাটি করলেন এবং খুব বৃষ্টিও হলো। (শওয়াহেদুল হক ৬৭ পৃঃ)

সবক: উপরোক্ত কাহিনী থেকে বুঝা গেল যে, সাহাবায়ে কিরাম বিপদের সময় হুযূরের খেদমতে হাজির হতেন এবং সেখানেই সব সমস্যার সমাধান পেতেন। এটাও বুঝা গেল যে হযরত ওমর ফারুক (রাদিআল্লাহু আনহু) এর শান অনেক উচ্চ এবং তিনি বরহক খলীফা ছিলেন। তিনি এত সুভাগ্যবান যে, হুযূরের বেছাল শরীফের পরও সালাম ও পয়গাম লাভ করেন।

কাহিনী নং-৪২
উম্মে ফাতেমার ফরিয়াদ—
সিকন্দরীয়ার অধিবাসী উম্মে ফাতিমা নামে এক মহিলা মদীনা মনোয়ারায় হাজির হওয়ার পর ওর এক পা ক্ষত ও অবশ হয়ে যায়। ফলে চলা ফেরা করতে অক্ষম হয়ে গেল। লোকেরা মক্কা মুয়াজ্জামার দিকে যাত্রা দিল কিন্তু সে যেতে পারলো না। একদিন সে কোন প্রকারে রওজা পাকে হাজির হলো এবং রওজা পাক তওয়াফ করতে করতে বললো, - ইয়া হাবীবাল্লাহ! ইয়া রসুলাল্লাহ! লোকেরা চলে গেল। আমি রয়ে গেলাম। হুযূর, আমাকে হয়তো পাঠানোর ব্যবস্থা করুন অথবা আপনার সমীপে তলব করুন। সে এ রকম বলতে ছিল। ইত্যবসরে তিনজন আরবী যুবক মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো, মক্কা মুয়াজ্জমায় কে যেতে চাচ্ছে? উম্মে ফাতেমা সঙ্গে সঙ্গে বললো, আমি যেতে চাচ্ছি। ওদের মধ্যে একজন ওকে বললো, তুমি দাঁড়াও। উন্মে, ফাতেমা বললো, আমি দাঁড়াতে পারি না। যুবকটি বললো, আপনার পা লম্বা করুন, সে পা লম্বা করলো। যখন ওরা ক্ষত পা দেখলো, তখন ওরা তিন জনই বলে উঠলো ঠিক আছে, এ সে। অতঃপর ওরা ওকে উঠায়ে বাহনের উপর বসায়ে দিল এবং মক্কা মুয়াজ্জামায় পৌঁছায়ে দিল। উম্মে ফাতেমা ওদের এ সহযোগিতার কারণ জিজ্ঞেস করলে, ওদের একজন বললো, আমাদেরকে স্বপ্নে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন-এ মহিলাকে মক্কায় পৌঁছায়ে দাও। উম্মে ফাতেমা বলেন, আমি খুব আরামে মক্কায় পৌঁছে গেলাম। (শওয়াহেদুল হক ১৬৫ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এখনও প্রত্যেক ফরিয়াদীর ফরিয়াদ শুনেন এবং প্রত্যেক সমস্যার সমাধান দেন। তবে শর্ত হলো যে ফরিয়াদী মনে প্রাণে এবং আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে ইয়া হাবীব ইয়া রসূল বলারও অভ্যস্থ হওয়া চাই।

কাহিনী নং-৪৩
এক হাশেমী মহিলা—
মদীনা মনোযারায় এক হাশেমী মহিলাকে কতেক লোক জ্বালাতন করতো। একদিন সে হুযুরের রওজায় হাজির হয়ে আরয করলো, ইয়া রসুলল্লাহ! এরা আমাকে জ্বালাতন করছে। রওজা পাক থেকে আওয়াজ আসলো, আমার সেই উত্তম আদর্শ কি তোমার সামনে নেই? শত্রুরা আমাকে কষ্ট দিয়েছে, আমি সবর করেছি। আমার মত তুমিও সবর কর। সেই মহিলা বললো, আমি বড় সান্তনা পেলাম এবং কয়েকদিন পর দেখলাম যে, জ্বালাতনকারীরা সবাই মরে গেল। (শওয়াহেদুল হক ১৬৫ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সবার ফরিয়াদ শুনেন এবং প্রত্যেক মজলুমের জন্য তাঁর দরবার উন্মুক্ত এবং 'ইয়া রসুলল্লাহ' বলার দ্বারা হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পক্ষ থেকে রহমত ও সান্তনা পাওয়া যায়।

কাহিনী নং -৪৪
এক অগ্নি উপাসকের কাছে হুযুরের পয়গাম—
শিরাযের এক বুজুর্গ হযরত ফাশ (রহমতুল্লাহ আলাইহি) বলেন, আমার ঘরে এক শিশু জন্ম গ্রহণ করে কিন্তু আমার কাছে খরচ করার জন্য কোন টাকা পয়সা ছিল না। তখন মৌসুম ছিল খুবই শীতের, বের হওয়ার উপায় ছিল না। এসব চিন্তা করে শুয়ে পড়লাম। স্বপ্নে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর যিয়ারত নছীব হলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার? 
আমি আরয করলাম, হুযুর ব্যয় ভার বহন করার মত আমার কাছে কিছু নেই, তাই এ নিয়ে খুবই চিন্তায় পড়েছি। 
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, সকালে অমুক অগ্নি উপাসকের ঘরে যেও এবং ওকে বলিও, তোমাকে রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন যে, আমাকে বিশ দিনার দেয়ার জন্য। হযরত ফাশ (রহমতুল্লাহ আলাইহি) সকালে ঘুম থেকে উঠে চিন্তায় পড়লেন যে, একজন অগ্নি উপাসকের ঘরে কিভাবে যাই এবং কি করে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পয়গাম ওকে শুনাই। এটাও সত্য যে স্বপ্নে রসূলকে দেখলে সত্যিকার রসূলই হয়ে থাকে। এ দৌদল্যমান অবস্থায় সেই দিন চলে গেল। 

দ্বিতীয় রাত পুনরায় হুযূরের যিয়ারত নছীব হলো, হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন তুমি ওসব চিন্তা ভাবনা ত্যাগ কর। অগ্নি উপাসকের কাছে গিয়ে আমার পয়গাম পৌঁছাও। সে মতে সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি আগ্নি উপাসকের ঘরের দিকে যাত্রা দিলাম। গিয়ে দেখি সেই অগ্নি উপাসক স্বীয় হাতে কিছু নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যখন আমি ওর কাছে পৌঁছলাম, তখন একেত অপরিচিত, দ্বিতীয়তঃ প্রথমবার এসেছি, তাই লজ্জায় কিছু বলতে পারলাম না। সেই অগ্নি উপাসক নিজেই বললো, বড় মিয়া! কি কোন কিছু বলার আছে? আমি বললাম, হ্যাঁ, আমাকে রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তোমার কাছে পাঠিয়েছেন এবং আমাকে বিশ দিনার দেয়ার জন্য বলেছেন। মজুসী (অগ্নি উপাসক) স্বীয় হাত খুললো এবং বললো, নিন, এ বিশ দিনার আমি আপনার জন্য হাতে নিয়ে রেখেছি এবং আপনার অপেক্ষায় ছিলাম। 

হযরত ফাশ দিনার গুলো নিলেন এবং মজুসীকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, আমিতো স্বপ্নে রসূলুল্লাহর নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে এখানে এসেছি। কিন্তু আমি যে আসবো এটা তোমার কিভাবে জানা হলো? সে বললো, আমি রাত্রে এ রকম আকৃতির একজন নুরানী বুজুর্গকে স্বপ্ন দেখেছি। তিনি আমাকে বলেছেন-কাল তোমার কাছে এক অভাবী ব্যক্তি আসবে, ওকে বিশটি দিনার দিও। তাই এ বিশ দিনার হাতে নিয়ে কাল থেকে অপেক্ষা করছি। হযরত ফাশ (রহমতুল্লাহ আলাইহি) ওর মুখে যখন রাত্রে সাক্ষাত প্রাপ্ত নুরানী বুজুর্গের আকৃতির কথা শুনলেন, তখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে, উনি হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন। তাই হযরত ফাশ ওকে বললেন, সেই নূরানী ব্যক্তিটা ছিলেন রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)। এ কথা শুনে মজুসী কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললো, আমাকে আপনার ঘরে নিয়ে চলুন। অতঃপর সে হযরত ফাশ (রহমতুল্লাহ আলাইহি) এর ঘরে এসে মুসলমান হয়ে গেল। ওর দেখা দেখি ওর পরিবার পরিজনের সবাই মুসলমান হয়ে গেল। (শওয়াহেদুল হক ১৬৯ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর রহমতের দৃষ্টি যার উপরই পতিত হয়, ওর কেল্লা ফতেহ। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় অভাবী বান্দাদের ফরিয়াদ শুনেন এবং বেছাল শরীফের পরও অভাবীদের সাহায্য করেন।

কাহিনী নং-৪৫
স্বপ্নে প্রাপ্ত দুধ—
হযরত শেখ আবদুল্লাহ (রহমতুল্লাহ আলাইহি) বলেন, একবার আমি মদীনা মনোয়ারায় মসজিদে নববীর মেহরাবের কাছে এক বুজুর্গ ব্যক্তিকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি জেগে উঠলেন এবং জাগা মাত্রই রওজা পাকের কাছে গিয়ে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি সালাম পেশ করলেন এবং মুচকি হেসে ফিরে আসছিলেন। সেখানকার একজন খাদেম তাঁর এ মুচকি হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আমি খুবই ক্ষুধার্ত ছিলাম। এ অবস্থায় আমি রওজাপাকে এসে ক্ষুধার অভিযোগ করি। স্বপ্নে আমি হুযূরকে দেখলাম। তিনি আমাকে এক কাপ দুধ প্রদান করলেন। আমি পেটভরে সেই দুধ পান করলাম। অতঃপর সেই বুজুর্গ তাঁর হাতের তালুতে মুখ থেকে থুথু ফেলে দেখালেন যে তখনও দুধের লক্ষণ ছিল। (হুজ্জাতুল্লাহে আলাল আলামীন ৮০৪ পৃঃ)

সবক: হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কে যারা স্বপ্নে দেখেন, তারা সত্যিই হুযূরকে দেখেন এবং স্বপ্নে হুযূর যেটা দান করেন, সেটা বাস্তবিকই দান করা হয়। হুযূর আজও সেই রকম জীবিত, যেরকম আগে ছিলেন।

কাহিনী নং-৪৬
স্বপ্নে প্রাপ্ত রুটি—
হযরত আবুল খায়ের (রহমতুল্লাহে আলাইহি) বলেন, একবার আমি পাঁচ দিনের উপবাস অবস্থায় মদীনা মনোয়ারায় পৌঁছেছিলাম। আমি রওজা পাকে হাজির হয়ে প্রথমে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) -এর প্রতি সালাম পেশ করলাম। অতঃপর হযরত আবু বকর ও ওমর (রাদিআল্লাহু আনহুমা) এর প্রতি সালাম পেশ করলাম। এরপর হুযুরের সমীপে আরয করলাম, ইয়া রসুলল্লাহ! আমি তো আপনার মেহমান। আমি পাঁচ দিনের উপবাস। হযরত আবুল খায়ের (রহমতুল্লাহে আলাইহি) বলেন, এরপর আমি মিম্বরের কাছে শুয়ে গেলাম। তখন আমি স্বপ্ন দেখলাম যে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তশরীফ এনেছেন, তাঁর ডানে হযরত ছিদ্দিকে আকবর, বামে হযরত ওমর এবং সামনে হযরত আলী (রাদিআল্লাহু আনহুম) ছিলেন। হযরত আলী আগে গিয়ে আমাকে সজাগ করে দিয়ে বললেন উঠ, দেখ, রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এসেছেন এবং তোমার জন্য খাবার এনেছেন। আমি উঠলাম এবং দেখলাম যে হুযূরের হাতে রুটি। হুযূর সেই রুটি আমাকে প্রদান করলেন। আমি হুযুরের নুরানী কপালে চুমু দিয়ে সেই রুটি নিয়ে নিলাম এবং খেতে লাগলাম। আধা- আধি খাওয়ার পর হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তখন দেখি, বাকী আধা-রুটি আমার হাতে রয়েছে। (হুজ্জাতুল্লাহি আলাল আলামীন ৮০৫ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বেছাল শরীফের পরও আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক বন্টনকারী এবং অভাবীদের সাহায্যকারী। বুজুর্গানে কিরাম নিজেদের অভাব অভিযোগ বারগাহে নববীতে পেশ করতেন। হুযূর বেছালের পরও স্বীয় গোলামদের ফরিয়াদ পূর্ণ করেন।

কাহিনী নং-৪৭
রোমের বাদশাহের কয়েদী—
স্পেনের এক নেককার লোকের ছেলেকে রোমের বাদশাহ বন্দী করেছিল। নেক্ কার লোকটি হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) -এর কাছে আর্জি পেশ করার জন্য মদীনা মনোয়ারার উদ্দেশ্যে যাত্রা দিলেন। রাস্তায় এক বন্ধুর সাথে দেখা হলো, বন্ধু জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাচ্ছ? তখন সে বললো আমার ছেলেকে রোমের বাদশাহ বন্দী করেছে এবং তিনশ টাকা জরিমানা করেছে। আমার কাছে তো এত টাকা নেই যে, যা দিয়ে ওকে মুক্ত করতে পারবো। তাই আমি হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে ফরিয়াদ করার জন্য যাচ্ছি। বন্ধুটি বললো মদীনা মনোয়ারা যাওয়ার কি প্রয়োজন আছে। প্রত্যেক জায়গা থেকে তো হুযুরের শাফায়াত কামনা করা যায়। নেক্কার লোকটি বললেন, তা ঠিক, তবুও আমি ওখানে হাজির হবো। সেমতে সে মদীনা মনোয়ারা পৌঁছে রওজা শরীফে হাজির হয়ে স্বীয় হাজত পেশ করলেন। স্বপ্নে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাক্ষাত লাভ করলেন। হুযূর ওকে বললেন, যাও নিজ শহরে ফিরে যাও। ফিরে এসে দেখি, ছেলে ঘরে এসে গেছে। ছেলের কাছে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা জানতে চাইলে, ছেলে বললো অমুক রাত আমাকে ও আমার সকল সাথী বন্দীদেরকে বাদশাহ স্বয়ং মুক্তি করে দিয়েছেন। নেক্কার বান্দাটি হিসেব করে দেখলেন যে এটা সেই রাত্রি ছিল, যে রাত সে হুযুরের সাক্ষাত লাভ করেছিলেন এবং হযূর বলেছিলেন, যাও, নিজ শহরে ফিরে যাও। (হুজ্জাতুল্লাহি আলাল আলামীন ৭৮০পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক বিপদ গ্রস্ত ব্যক্তির সাহায্য করেন এবং রওজা মুবারকে তশরীফ রেখেও স্বীয় উম্মতের সহায়তা করেন। যে কোন জায়গা থেকে তাঁর গোলাম তাঁর সাহায্য কামনা করলে, তিনি তাঁর রহমতের হাত বাড়িয়ে দেন। বুজুর্গানে কিরাম হুযুরের দরবারে বিভিন্ন ফরিয়াদ করতেন এবং কেউ একে শিরক বলেনি।

কাহিনী নং-৪৮
খুনীর মুক্তিলাভ—
বাগদাদের বিচারপতি ইব্রাহিম বিন ইসহাক এক রাতে স্বপ্নে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কে দেখলেন, হুযুর ওকে ফরমালেন, খুনীকে ছেড়ে দাও। এ নির্দেশ শুনে বাগদাদের বিচারপতি কম্পমান অবস্থায় ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। তিনি জেলখানার কর্মকর্তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের জেল খানায় এমন কোন অপরাধী আছে কি, যে খুনী? কর্মকর্তারা বললো, হ্যাঁ, এমন এক ব্যক্তি আছে, যার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ রয়েছে। বিচারপতি নির্দেশ দিলেন, ওকে আমার সামনে হাজির কর। নির্দেশ মত হাজির করা হলো। বাগদাদের বিচারপতি জিজ্ঞেস করলেন, সত্যি সত্যি বল, ঘটনা কি? সে বললো, মিথ্যা কখনো বলবো না। যা বলবো, সত্যিই বলবো। ব্যাপার হলো, আমরা কয়েকজন মিলে ফুর্তি ও অসৎকাজ করতাম। একজন বৃদ্ধা মহিলাকে আমরা এ কাছে নিয়োজিত করেছিলাম। সে প্রতি রাতে যে কোন বাহানা করে নানা ভাবে ফুসলিয়ে আমাদের জন্য মহিলা নিয়ে আসতো। এক রাতে এমন এক মহিলা নিয়ে আসলো, যে আমার মনোজগতে আমূল পরিবর্তন এনে দিল। মেয়েটিকে যখন আমাদের সামনে নিয়ে আসলো, সে চিৎকার দিয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে। আমি ওকে উঠায়ে অন্য কামবায় নিয়ে গিয়ে হুস করার চেষ্টা করলাম। ওর হুম আসলে আমি ওকে চিৎকার ও বেহুম হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। সে বললো, ওহে নওযোয়ান! আমার ব্যাপারে আল্লাহকে ভর কর। এ বৃদ্ধা আমাকে বাহানা করে এখানে নিয়ে এসেছে।
দেখ, আমি একজন ভদ্রঘরের মহিলা এবং সৈয়দ বংশীয়। আমার নানা হচ্ছে রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এবং আমার মা হচ্ছে ফাতিমাতুজ যহোরা খবরদার ! এ সম্পর্কের কথা স্মরণ রেখ এবং আমার প্রতি কুদৃষ্টিতে তাকওনা। আমি এ সৈয়দা মহিলার মুখের কথা শুনে ঘাবড়িয়ে গেলাম এবং আমার সাথীদের কাছে সব কথা খুলে বললাম। আরও বললাম যদি পরিনামে মঙ্গল চাও, তাহলে এ পবিত্র ও সম্মানিত মহিলার সাথে কোন প্রকার বেআদবী করনা। কিন্তু আমার বন্ধুরা আমার কথা উল্টা বুঝলো, তারা মনে করলো, আমি ওদেরকে বাদ দিয়ে এককী ভোগ করতে চাচ্ছি। এ ধারনার বশবর্তী হয়ে ওরা আমার বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত হয়ে গেল। আমি বললাম তোমাদের অসৎ উদ্দেশ্য কিছুতেই চরিতার্থ করতে দেব না। লড়বো, মরবো কিন্তু এ সৈয়দ বংশীয় ভদ্র মহিলার প্রতি কুদৃষ্টি কিছুতেই সহ্য করবো না। শেষ পর্যন্ত ওরা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং ওদের হামলায় আমি আঘাতও পেলাম। ইত্যবসরে ওদের একজন সেই মহিলার কামরার দিকে যেতে চাচ্ছিল। আমি ওকে বাধা দেয়ায় সে আমাকে আক্রমন করলো। তখন আমি ওকে ছুরি দ্বারা পাল্টা আক্রমন করে ওকে মেরে ফেললাম। অতঃপর সেই মহিলাকে নিজের হেফাজতে নিয়ে যখন বের হয়ে আসলাম, তখন চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল এবং আমি ছুরি হাতে ধরা পড়লাম।

বাগদাদের বিচারপতি বললেন, যাও, তোমাকে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নির্দেশে মুক্তি দেয়া হলো। (হুজ্জাতুল্লাহে আলাল আলামীন ৮১৩ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় উম্মতের প্রত্যেক নেক্কার ও বদকার সম্পর্কে অবহিত এবং প্রত্যেক নেক ও বদ আমল দেখেন। হুযুরের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ের ব্যাপারে সম্মান প্রদর্শনের দ্বারা মানুষের পরিনাম ভাল হয়ে যায়। সুতরাং হুযূরের সাথে সম্পর্কিত প্রত্যেক বিষয়ের বেলায় আন্তরিক সম্মানবোধ থাকা উচিত।

কাহিনী নং-৫৯
দ্বীপপুঞ্জের কয়েদী—
হযরত ইবনে মীর যাউক বর্ণনা করেন যে, শকর দ্বীপে এক মুসলমানকে শত্রুরা গ্রেফতার করে হাত পা লোহার শিকল দ্বারা বেঁধে জেলখানায় পাঠিয়ে দিল। সেই মুসলমানটি হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নাম নিয়ে ফরিয়াদ করলো এবং জোরে জোরে ইয়া রসূলল্লাহ বলতে লাগলো। কাফিরেরা এ শ্লোগান শুনে বললো, তোমার রসূলকে বল, যেন তোমাকে এ বন্দীদশা থেকে মুক্ত করতে আসে। যখন অর্ধরাত হলো, তখন জেলখানায় একজন লোক এসে সেই কয়েদীকে বললো, উঠ, আযান দাও। কয়েদী উঠে আযান দিতে শুরু করলো,  'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান্ রাসূলুল্লাহ্' এ বাক্য উচ্চারণ করলো, তখন ওর সর শিকল ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল এবং সে মুক্ত হয়ে গেল। এরপর ওর সামনে একটি বাগান এসে গেল এবং সে বাগানের মধ্যে দিয়ে বের হয়ে আসলো। সকালে ওর মুক্তির ঘটনা সমগ্র দ্বীপাঞ্চলে জানাজানি হয়ে গেল। (শওয়াহেদুল হক ১৬২পৃঃ)

সবক : মুসলমানগণ যেন সব সময় নারায়ে রেসালত বলেন। রসূলের শত্রুরাই এ শ্লোগান নিয়ে রসিকতা করে। হুযুরের নাম মুবারক মুশকিল আসানকারী। এ নাম উচ্চারণের সাথে সাথে মুছিবত বিদুরীত হয়ে যায়।

কাহিনী নং -৫০
আটকে পড়া জাহাজ—
এক দ্বীনদার ব্যক্তিকে এক কাফির বাদশাহ বন্দী করেছিল। তিনি বলেন, বাদশাহের একটি বড় জাহাজ নদীতে আটকে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও সেটাকে নদী থেকে বের করতে পারলো না। জেলখানা থেকে সমস্ত কয়েদীকে ডেকে আনলো, যেন সবাই মিলে জাহাজটি বের করার চেষ্টা করে। চার হাজারের মত কয়েদী আপ্রাণ চেষ্টা করেও জাহাজকে সরাতে পারলো না। তখন তারা বাদশাহের কাছে গিয়ে বললেন, জেলখানায় যে সব মুসলমান কয়েদী আছে, ওদেরকে বলতে পারেন, হয়তো ওরা জাহাজ সরাতে পারবে। তবে শর্ত হচ্ছে, ওরা সে শ্লোগান দেবে, সেটা থেকে বাঁধা দেয়া যাবে না।
বাদশাহ এ শর্ত মেনে নিয়ে সব মুসলমান কয়েদীকে ছেড়ে গিয়ে বললো, তোমরা তোমাদের খুশী মতো যে শ্লোগান দিতে চাও, সেটা দিয়ে জাহাজটা বের করে আনো। সেই দ্বীনদার ব্যক্তিটি বলেন, আমরা সবাই মিলে চারশ মত ছিলাম। আমরা এক সাথে নারায়ে রেসালতের শ্লোগান দিলাম এবং এক আওয়াজে ইয়া রসূলল্লাহ বলে যখন জাহাজকে ধাক্কা দিলাম, তখন জাহাজ নড়ে উঠলো। এ শ্লোগান দিয়ে জাহাজকে আর থামতে দি নাই। একেবারে নদী থেকে বের করে দিয়েছি। (শওয়াহেদুল হক ১৬৩ পৃঃ)

সবক: নারায়ে রেসালত মুসলমানদের প্রিয় শ্লোগান। মুসলমানগণ যেন এটাকে সদা প্রচলিত রাখে। এ পবিত্র নাম দ্বারা বড় বড় মুশকিল আসান হয়ে যায়। যে ব্যক্তি নারায়ে রেসালতের বিরোধীতা করে, ওর থেকে বড় জাহিল আর কেউ হতে পারে না।

কাহিনী নং- ৫১
এক সৈয়দজাদী ও এক অগ্নিউপাসক—

সমরকন্দে এক বিধবা সৈয়দজাদী বাস করতেন। তাঁর কয়েকজন সন্তান ছিল। একদিন সে তাঁর ক্ষুধার্ত সন্তানদেরকে নিয়ে এক মুসলিম নেতার কাছে গেলেন এবং ওকে বললেন, আমি সৈয়দজাদী, আমার সন্তানগুলো উপবাস। ওদেরকে কিছু খেতে দিন। ধনদৌলতের মোহে বিভোর নাম সর্বস্ব সেই মুসলিম নেতা বললো, তুমি যদি সত্যিকার সৈয়দজাদী হও, তাহলে কোন প্রমান দেখাও। সৈয়দজাদী বললেন, আমি একজন গরীব বিধবা মহিলা, আমার কথা বিশ্বাস করুন, কি দলীল পেশ করবো? নেতা বললো, মুখের কথা বিশ্বাস করি না। দলীল দিতে না পারলে চলে যাও। সৈয়দজাদী সন্তানদেরকে নিয়ে ফিরে গেলেন এবং এক অগ্নিউপাসক নেতার কাছে গেলেন এবং তাঁর দুঃখের কথা শুনালেন। অগ্নি উপাসক বললো, মোহতরেমা, যদিওবা আমি মুসলমান নই, কিন্তু আপনার সৈয়দ বংশকে সম্মান করি। আসুন, আমার এখানে অবস্থান করুন, আমি আপানার রুটি কাপড়ের জিম্মাদার হলাম। এ বলে সে ওদেরকে স্বীয় ঘরে স্থান দিল, আর সন্তানদেরকে খাওয়ালো এবং খুবই আদরযত্ন করলো। দিবাগত রাতে সেই নাম সর্বস্ব মুসলমান নেতা স্বপ্নে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখলো যে, তিনি এক বিরাট নুরানী মহলের পাশে তশরীফ রেখেছেন। নেতাজি জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রসূলল্লাহ! এ নূরানী মহল কার জন্য? হুযূর ফরমালেন, মুসলমানের জন্য। সে বললো, হুযূর, আমি তো মুসলমান, এটা আমাকে প্রদান করুন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, তুমি যদি মুসলামন হও, তাহলে তোমার ইসলামের কোন প্রমাণ পেশ কর। নেতাজি এটা শুনে ভীষণ ঘাবড়িয়ে গেল। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, আমার সৈয়দজাদী তোমার কাছে গেলে তুমি ওর কাছে সৈয়দের দলীল চেয়েছ আর নিজে বিনা দলীলে এ মহলে প্রবেশ করতে চাও, তা কিছুতেই সম্ভব নয়। এরপর ওর ঘুম ভেঙ্গে গেল এবং খুবই কান্নাকাটি করলো। অতঃপর সেই সৈয়দজাদীকে খুঁজতে বের হলো। সে খবর পেল যে সৈয়দজাদী অমুক অগ্নিউপাসকের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। নেতাজি সেই অগ্নি উপাসকের কাছে গিয়ে বললো, আমার থেকে এক হাজার দেরহাম গ্রহণ কর এবং সৈয়দজাদীকে আমার কাছে হস্তান্তর কর। অগ্নি উপাসক বললো, আমি কি সেই নুরুনী মহলটি এক হাজার টাকায় বিক্রি করে দিব? কক্ষনো নয়। শুনুন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপনাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে যেই নুরানী মহল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন, তিনি আমাকেও স্বপ্নে দেখা দিয়ে কলেমা পড়ায়ে সেই নুরানী মহলে প্রবেশ করায়ে গেছেন। এখন আমিও স্ত্রী সন্তানসহ মুসলমান এবং হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে সুসংবাদ দিযে গেছেন যে- তুমি স্ত্রী-সন্তানসহ জান্নাতী। (নজহাতুল মাসালিস ১৯৪ পৃঃ ২ জিঃ)

সবক: দলীল তলবকারী নাম সর্বস্ব মুসলমান জান্নাত থেকে বঞ্চিত হলো এবং বিনা দলীলে রসূলের বংশধরের সম্মানকারী অগ্নিউপাসক ঈমান আনয়নে ধন্য হয়ে জান্নাত পেয়ে গেল। রসূলের আদব ও সম্মানের ব্যাপারে কথায় কথায় যারা দলীল তলব করে, তারা নাম সর্বস্ব মুসলমান।

কাহিনী নং- ৫২
আবদুল্লাহ বিন মুবারক ও এক সৈয়দজাদা—

হযরত আবদুল্লাহ বিন মোবারক (রহমতুল্লাহে আলাইহি) এক বড় সমাবেশ করে মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন এক সৈয়দজাদা ওনাকে বললেন, হে আবদুল্লাহ! এটা কেমন সমাবেশ? দেখুন আমি রসূলের আওলাদ এবং আপনার বাপতো এরকম ছিল না। হযরত আবদুল্লাহ বিন মুবারক জবাব দিলেন, আমি ঐ কাজ করছি, যা আপনার নানা জান করতেন এবং আপনি করতেছেন না। তিনি আরও বললেন, নিশ্চয় আপনি সৈয়দ এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বংশধর। এটাও সত্য যে আমার পিতা এ রকম ছিলেন না কিন্তু আপনার পিতা থেকে প্রাপ্ত ইলমের উত্তরাধিকারী হয়ে আমি প্রিয় পাত্র ও বুজুর্গ হয়ে গেছি। আর আপনি আমার পিতার উত্তরাধিকার গ্রহণ করে সম্মান লাভ করতে পারলেন না।

সেই রাতেই হযরত আবদুল্লাহ বিন মুবারক স্বপ্নে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কে দেখলেন, তাঁর চেহেরা মুবারক মলিন ছিল। তিনি আরয করলেন, ইয়া রসূলল্লাহ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপনার চেহারা মুবারক মলিন কেন? ফরমালেন, তুমি আমার এক সন্তানের বেলায় কটাক্ষ করেছ। আবদুল্লাহ বিন মুবারক ঘুম থেকে উঠে সেই সৈয়দজাদার সন্ধানে বের হলেন যেন ওনার থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারেন। এদিকে সেই সৈয়দজাদাও সেই রাত্রে স্বপ্নে হুযূরকে দেখলেন। হুযূর ওকে বলেছেন, বেটা, তুমি যদি ভাল হতে, তাহলে তোমাকে এ রকম কথা বলতো না। সৈয়দজাদাও ঘুম থেকে উঠে হযরত আবদুল্লাহ বিন মুবারকের সন্ধানে বের হলেন। উভয়ের সাক্ষাত হলো এবং উভয়ের নিজ নিজ স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করে একে অপরের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। (তাজকিরাতুল আউলিয়া ৭৩ পৃঃ)

সবক : আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উম্মতের প্রতিটি বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী এবং প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত। হুযুরের সাথে সম্পর্কিত কোন বিষয়ে কটাক্ষ করা হুযূরের কাছে খুবই অপছন্দ।

কাহিনী নং- ৫৩
হযরত আবুল হাসান খরকানী ও দরসে হাদীছ—

হযরত আবুল হাসান খরকানী (রহমতুল্লাহে আলাইহি) এর কাছে এক ব্যক্তি ইলমে হাদীছ পড়ার জন্য এসে ওনাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি হাদীছ কার কাছে পড়েছেন? হযরত খরকানী বললেন, আমি হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে হাদীছ পড়েছি। লোকটির বিশ্বাস হলো না। রাত্রে যখন শুইলেন স্বপ্নে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তশরীফ আনলেন এবং ফরমালেন, আবুল হাসান সত্য বলেছে, আমিই ওকে পড়ায়েছি। সকালে সে আবুল হাসানের খেদমতে হাজির হয়ে হাদীছ পড়তে লাগলেন, কতেক জায়গায় হযরত আবুল হাসন বলেন, এ হাদীছ আমাদের হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত নয়। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কিভাবে বুঝতে পারলেন? তিনি বললেন, তুমি যখন হাদীছ পড়তে শুরু করেছ তখন আমি হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর ভ্রু মুবারক দেখতে লাগলাম। আমার এ চোখদ্বয় হুযুরের ভ্রু মুবারকের উপর নিবিষ্ট রয়েছে। যখন হুযুরের ভ্রু মুবারক কুঁচকে যায়, তখন আমি বুঝে ফেলি যে, হুযূর এ হাদীছকে অস্বীকার করছেন। (তাজাকিরাতুল আওলিয়া ৪৭৬ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জীবিত এবং হাজির নাজির। নেক্কার বান্দাগণ এখনও হুযূরের দীদার লাভ করে থাকেন। যে হুযূরকে জীবিত স্বীকার করে না, সে নিজেই মৃত।

কাহনী নং- ৫৪
এক অলী ও এক মুহাদ্দিছ—
এক অলী, এক মুহাদ্দিসের দরসে হাদীছে উপস্থিত ছিলেন, মুহাদ্দিছ সাহেব একটি হাদীছ পড়লেন, এবং বললেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ রকম ফরমায়েছেন। তখন সেই অলী বললেন, এ হাদীছ বাতিল। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কখনো এ রকম বলেননি। মুহাদ্দিছ সাহেব বললেন, আপনি এ রকম কেন বলছেন? তখন ওলী এ জবাব দিলেন: দেখুন, নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপনার মাথার উপর অবস্থান করছেন এবং বলছেন, আমি কক্ষনো এ হাদীছ বর্ণনা করিনি।

মুহাদ্দিছ সাহেব এ কথায় বিস্মিত হয়ে গেলেন। ওলী তখন বললেন, আপনিও কি হুযূরকে দেখতে চান, তাহলে দেখে নিন। মুহাদ্দিছ সাহেব যখন উপরের দিকে তাকালেন, তখন হুযূরকে উপবেশন করা অবস্থায় দেখলেন। (ফয়ায়ে হাদীছিয়া ২১২ পৃঃ)

সবক: আমাদের হুযূর হাজির নাজির। কিন্তু দেখার জন্য অলীর দৃষ্টি দরকার। কোন ওলীয়ে কামিলের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারলে এখনও হুযুরের দীদার লাভ করা যায়।



৫/
কাহিনী নং- ৫৫
আম্বিয়ায়ে কিরামের কাহিনী

কাহিনী নং- ৫৫
হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও ইবলিস—

আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাগণের মধ্যে যখন ঘোষণা করলেন যে, আমি পৃথিবীতে আমার এক খলিফা সৃষ্টি করার মনস্থ করেছি। তখন অভিশপ্ত শয়তান এটাকে খুবই খারাপ মনে করলো এবং মনে মনে হিংসার আগুলে জ্বলতে লাগলো। অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)কে সৃষ্টি করে ফিরিশতাগণকে নির্দেশ দিলেন আমার খলিফার সামনে মাথানত কর তখন সবাই মাথানত করলেন কিন্তু অভিশপ্ত শয়তান অটল রইলো, মাথানত করলো না। ওর এ অহমিকা আল্লাহর কাছে পছন্দ হলো না। ওকে জিজ্ঞেস করলেন, হে ইবলিস, আমি যখন আমার কুদরতী হস্তে সৃষ্ট খলিফার সামনে মাথানত করার নির্দেশ দিলাম, তখন তুমি কেন মাথানত করলে না? শয়তান জবাব দিল, আমি আদম থেকে উত্তম। কেননা আমি আগুনের সৃষ্টি এবং সে মাটির সৃষ্টি। তাছাড়া একজন মানুষকে আমি কেন সিজদা করবো? আল্লাহ তাআলা ওর এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব শুনার পর ফরমালেন, মরদুদ, আমার রহমতের বারগাহ থেকে বের হয়ে যা, তুই কিয়ামত পর্যন্ত বহিষ্কৃত ও অভিশপ্ত। (কুরআন করীম সূরা বাকারা)

সবক: আল্লাহর রসূল ও তাঁর মকবুল বান্দাদের ইজ্জত ও তাজীম করার দ্বারা আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। ওনাদেরকে নিজেদের মত মানুষ মনে করে অবজ্ঞা করাটা শয়তানী কাজ। একজন নবীকে সর্বপ্রথম অবজ্ঞামূলক বশর (মানুষ) সম্বোধনকারী হলো শয়তান।

কাহিনী নং- ৫৬
শয়তানের থুথু—
আল্লাহ তাআলা যখন হযরত আদম আলাইহিস সালামের দেহ মুবারক তৈরী করলেন, তখন ফিরিশতাগণ এটা দেখতে লাগলেন। কিন্তু অভিশপ্ত শয়তান হিংসার আগুনে জ্বলতে লাগলো এবং হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) এর দেহ মুবারকের উপর থুথু নিক্ষেপ করলো, এ থুথু গিয়ে পড়লো নাভিস্থলে। আল্লাহ তাআলা হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দিলেন, ঐ জায়গা থেকে থুথু মিশ্রিত মাটিগুলো বের করে ফেল এবং সেটা দ্বারা কুকুর বানিয়ে দাও। নির্দেশ মুতাবেক শয়তানের থুথু মিশ্রিত সেই মাটি দ্বারা কুকুর সৃষ্টি করা হলো। কুকুর মানুষের ভক্ত এ জন্য যে, এর শরীরে আদমের মাটি রয়েছে। নাপাক এ জন্য যে, সেই মাটি শয়তানের থুথু মিশ্রিত এবং রাত্রি জাগরণের কারণ হলো, সেই মাটিতে জিব্রাইলের হাত লেগেছে। (রুহুল বয়ান ৬০০ পৃঃ ১ম জিঃ)

সবক: শয়তানের থুথু দ্বারা আদম আলাইহিস সালামের কোন ক্ষতি হয়নি। ববং নাভিস্থল পেটের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। এ রকম আল্লাহর নেক বান্দাদের বারগাহে বেআদবী করার দ্বারা ওনাদের কোন ক্ষতি হয় না। বরং ওনাদের শান আরও উদ্ভাসিত হয়। নেক্কার বান্দাদেরকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার চোখে দেখাটা হচ্ছে শয়তানী কাজ।

কাহিনী নং – ৫৭
হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও বনের হরিণ—
হযরত আদম আলাইহিস সালাম যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে তশরীফ আনলেন, তখন পৃথিবীর বিভিন্ন পশু তাঁকে দেখার জন্য ভীড় জমালো। তিনি প্রত্যেক পশুর জন্য ওদের উপযুক্ত দুআ করলেন। বনের কিছু হরিণও তাঁকে সালাম করা ও দেখার উদ্দেশ্যে হাজির হলো। তিনি স্বীয় হাত মুবারক ওদের পিঠের উপর বুলিয়ে দিলেন এবং ওদের জন্য দুআ করলেন। এতে ওদের নাভিতে মেশকের সুগদ্ধি সৃষ্টি হয়ে গেল। এরা সুগন্ধির এ তোহফা নিয়ে যখন তাদের স্বজাতির কাছে ফিরে গেল, তখন প্রত্যেকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, তোমারা এ সুগন্ধি কোথা থেকে নিয়ে আসলে? ওরা বললো, আল্লাহর নবী হযরত আদম আলাইহিস সালাম পৃথিবীতে তশরীফ এনেছেন, আমরা ওনাকে দেখতে গিয়েছিলাম। উনি রহমতে ভরপুর স্বীয় হাত মুবারক আমাদের পিঠের উপর বুলিয়ে দিয়েছেন। এতে এ সুগন্ধি সৃষ্টি হয়েছে। তখন অপরাপর হরিণেরা বললো, তাহলে আমাদেরকেও যেতে হয়। এ বলে ওরাও গেল এবং আদম আলাইহিস সালাম ওদের পিঠের উপরও হাত বুলিয়ে দিলেন, কিন্তু ওদের মধ্যে সেই সুগন্ধি সৃষ্টি হলো না, ওরা যে রকম গেল, সে রকম ফিরে আসলো এবং আশ্চর্য হয়ে বললো, কি ব্যাপার! তোমরা গেলে সুগন্ধি পেলে আর আমরা গেলাম কিছুই গেলাম না। তখন ওরা উত্তর দিল, দেখ, আমরা গিয়েছিলাম কেবল সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে কিন্তু তোমাদের উদ্দেশ্য শুদ্ধ ছিল না। (নজহাতুল মাজালিস-৪পৃঃ ১ জিঃ)

সবক: আল্লাহর নেকবান্দাদের দরবারে নেক নিয়তে হাজির হলে অনেক কিছু পাওয়া যায়। যদি কোন বদবখত তথায় গিয়ে কিছু না পায়, তাহলে সেটা ওর নিয়তের দোষ। এতে নেকবান্দাদের কোন দোষ নেই।

কাহিনী নং- ৫৮ 
নূহ আলাইহিস সালামের কিস্তি—
হযরত নূহ আলাইহিস সালমের কউম' বড় পাপিষ্ঠ ও অপরিনামদর্শী ছিল। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম সাড়ে নয়শ বছর দিনরাত সত্যের প্রচার করা সত্ত্বেও ওদেরকে সৎপথে আনতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত উনি ওদের ধ্বংসের জন্য আল্লাহর কাছে এ বলে প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! ওদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দাও। তাঁর এ বদদুআ কবুল হলো এবং আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিলেন, হে নূহ! আমি এক ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করবো এবং ওসব কাফিরদেরকে ধ্বংস করে দিব। তুমি নিজের জন্য এবং তোমার মুষ্টিমেয় অনুসারীদের জন্য একটি কিস্তি তৈরী করে নাও।

নির্দেশ মুতাবেক হযরত নূহ আলাইহিস সালাম জংগলে গিয়ে কিস্তি তৈরী করতে শুরু করলেন। কাফিরেরা তাঁকে দেখতো ও জিজ্ঞেস করতো, হে নূহ, কি করতেছ? তিনি বললেন, এমন এক ঘর তৈরী করছি, যেটা পানির উপর চলতে পারে। কাফিরেরা এ উত্তর শুনে হাসতো ও মসকরা করতো। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম বলতেন, আজ তোমরা হাসতেছ কিন্তু এমন একদিন আসবে যেদিন আমি তোমাদেরকে দেখে হাসবো। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের এ কিস্তি তৈরী করতে দু'বছর সময় লেগেছিল। এর দৈর্ঘ্য ছিল তিনশ গজ, প্রস্থ পঞ্চাশ গজ এবং উচ্চতা ছিল ত্রিশ গজ। এ কিস্তি তিন তলা বিশিষ্ট বানানো হয়েছিল। নিচের তলায় হিংস্র জীবজন্তু, মধ্যম তলায় চতুষ্পদ জন্তু ইত্যাদি এবং উপর তলায় স্বয়ং হযরত নূহ আলাইহিস সালাম, তাঁর অনুসারীগণ এবং খাদ্য সামগ্রী ছিল। বিভিন্ন পাখীও উপর তলায় ছিল। যখন আল্লাহর হুকুমে ভয়াল জলোচ্ছ্বাস হলো, তখন কিস্তির আরোহীরা ব্যতীত দুনিয়ার বুকে যারা ছিল, সবাই ডুবে মারা গেল। এমনকি নূহ আলাইহিস সালামের পুত্র কেনানও, যে কাফির ছিল, সেই মহা প্লাবনে ডুবে গিয়েছিল। (কুরআন করীম সূরা হুদ, খাযায়েনুল এরফান ৩৩০ পৃঃ)

সবক: খোদা তাআলার নাফরমানী দ্বারা এ পৃথিবীতেও অধঃপতন ও ধ্বংসের শিকার হতে হয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্যের দ্বারা উভয় জাহানে নাজাত ও কল্যাণ পাওয়া যায়।

কাহিনী নং- ৫৯
নূহ আলাইহিস সালামের প্লাবন ও এক বৃদ্ধা—
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহর নির্দেশে কিস্তি বানাতে শুরু করলেন, তখন এক মুমিন বৃদ্ধা নূহ আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি এ কিস্তি কেন তৈরী করতেছেন? তিনি বললেন, এক মহা প্লাবন হবে, সেটায় সব কাফির ডুবে মারা যাবে এবং মুমিনগণ এ কিস্তির বদৌলতে বেঁচে যাবে। বুড়ী আরয করলো, হুযূর যখন তুফান আসার সময় হবে, তখন আমাকে খবর দিবেন যেন আমিও কিস্তিতে আরোহন করত পারি। বুড়ীর কুড়ে ঘর শহর থেকে কিছু দূরে ছিল। তাই নূহ আলাইহিস সালাম অন্যান্য লোকদেরকে কিস্তিতে উঠাতে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় বুড়ির কথা মোটেই স্মরণ ছিল না। শেষ পর্যন্ত মহাপ্লাবনের আকৃতিতে আল্লাহর ভয়ানক আজাব অবতীর্ণ হলো, পৃথিবীর সব কাফির ধ্বংস হয়ে গেল। অতঃপর যখন এ আজাব বন্ধ হলো, পানি সরে গেল এবং কিস্তির আরোহীগণ কিস্তি থেকে নেমে আসলো, তখন সেই বুড়ী হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কাছে হাজির হয়ে বলতে লাগলো, হুযূর সেই মহা প্লাবন কবে আসবে? আমি প্রতি দিন এ অপেক্ষায় আছি যে, কখন আপনি কিস্তিতে আরোহন করার জন্য বলবেন। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম বললেন, মহাপ্লাবন তো হয়ে গেছে এবং সব কাফির ধ্বংস হয়ে গেছে। কিস্তির বদৌলতে আল্লাহ তাআলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে রক্ষা করেছেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! তুমি কিভাবে জীবিত রইলে? আরয করলো, ব্যাপার বুঝে গেছি। যে খোদা আপনাকে কিস্তির বদৌলতে রক্ষা করেছেন, আমাকে আমার কুড়ে ঘরের বদৌলতে রক্ষা করেছেন। (রুহুল বয়ান ৮৫ পৃঃ ২ জিঃ)

সবক: যে খোদার হয়ে যায়, খোদা যেকোন অবস্থায় ওর সাহায্য করেন। বাহ্যিক কোন উসীলা ছাড়াও ওর কাজ হয়ে যায়।

কাহিনী নং - ৬০
হযরত ওযাইর আলাইহিস সালাম ও আল্লাহর কুদরতের বিস্ময়কর নিদর্শন—
ইসরাইল বংশের লোকেরা যখন আল্লাহর নাফরমানীতে সীমা অতিক্রম করলো, তখন আল্লাহ তাআলা বখতে নছর নামে এক জালিম বাদশাহকে ওদের উপর চাপিয়ে দিলেন। সে বনী ইসরাইলীদেরকে হত্যা, গ্রেপ্তার ও উৎখাত করলো এবং বায়তুল মুকাদ্দাসকে ধ্বংস ও ধুলিসাৎ করেদিল। হযরত ওযাইর আলাইহিস সালাম একদিন শহরে এসে দেখলেন যে শহর বিরান হয়ে গেছে। সারা শহরে কোন লোকজন দেখা গেল না। শহরের সমস্ত ইমারত বিধ্বস্ত দেখলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি ভীষণ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন- এ মৃত শহরকে আল্লাহ পুনরায় কিভাবে জীবিত করবেন!
তিনি এক গাধার উপর উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁর কাছে এক বরতন খেজুর ও এক পেয়ালা আঙ্গুরের রস ছিল। তিনি তাঁর গাধাকে এক বৃক্ষের সাথে বেঁধে তিনি সেই বৃক্ষের নিচে ঘুমায়ে পড়লেন। এ ঘুমন্তাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁর রূহ কবজ করলেন। গাধাটাও মারা গেল। এ ঘটনার সত্তর বছর পর আল্লাহ তাআলা পারস্যের এক বাদশাহকে তথায় রাজত্ব দান করলেন। সে সৈন্য সমস্ত নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস এসে একে আগের থেকেও উত্তম ডিজাইনে গড়ে তুললেন। বনী ইসরাইলের মধ্যে যারা জাবিত ছিল, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পুনরায় এখানে আনলেন এবং তারা বায়তুল মুকাদ্দস ও এর আশে পাশে বসতি স্থাপন করলো, ক্রমান্বয়ে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগালো। আল্লাহ তাআলা হযরত ওযাইর আলাইহিস সালামকে দুনিয়াবাসীর দৃষ্টির আড়ালে রেখেছিলেন। কেউ তাঁকে দেখতে পেল না। যখন তাঁর ওফাতের শত বছর অতিবাহিত হলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে দ্বিতীয়বার জীবিত করলেন। যে সময় তিনি ঘুমায়ে ছিলেন, তখন সকাল বেলা ছিল এবং একশ বছর পর যখন তাঁকে পুনরায় জীবিত করা হলো, তখন সন্ধ্যা বেলা ছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে ওযাইর তুমি এখানে কতক্ষণ অবস্থান করলে? তিনি অনুমান করে বললেন, একদিন বা এর কিছু কম হতে পারে। তিনি মনে করেছিলেন, এ সন্ধ্যাটা সেই দিনের, যে দিনের সকালে তিনি শুয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি এখানে একশ বছর অবস্থান করেছ, তোমার খাবার ও পানি অর্থাৎ খেজুর ও আঙ্গুরের রস দেখ, অবিকলই রয়েছে। এতে কোন গন্ধও হয়নি। তোমার গাধাকেও দেখ, সেটা মরে পঁচে গলে গিয়েছে। অংগ প্রত্যঙ্গ বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছে এবং হাডিডগুলো সাদা হয়ে চমকাচ্ছে। তাঁর সামনেই আল্লাহ তাআলা সেই গাধাকেও জীবিত করলেন। প্রথমে এর অংগ প্রত্যংগ গুলো একত্রিত হয়ে যথাস্থানে স্থাপিত হলো, হাড্ডি গুলোর উপর মাংসের প্রলেপ হলো, মাংসের উপর চামড়া সৃষ্টি হলো, চামড়ার উপর পশম গজালো, অতঃপর এতে প্রাণের সঞ্চার হলো এবং দেখতে দেখতে সেটা উঠে দাঁড়ালো এবং আওয়াজ করতে লাগলো। তিনি আল্লাহ তাআলার এ কুদরত দেখে বললেন, আমি জানি এবং বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। এরপর তিনি স্বীয় বাহনের উপর আরোহন করে নিজ মহল্লার দিকে আসলেন। কেউ তাঁকে চিনলো না। অনুমান করে তিনি স্বীয় ঘরের দিকে গেলেন। তাঁর বয়স সেই চল্লিশ বছরই ছিল। তাঁর ঘরের সামনে এক দুর্বল বৃদ্ধাকে দেখলেন, যার পাদ্বয় ছিল অবশ এবং চক্ষুদ্বয় ছিল দৃষ্টিহীন। সে ছিল তাঁর ঘরের বাদী এবং সে তাঁকে দেখেছিল। তিনি ওকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি ওযাইরের ঘর? সে বললো, হ্যাঁ, কিন্তু ওযাইর তো একশ বছর আগে লাপাত্তা হয়ে গেছে। এ বলে সে খুবই কান্নাকাটি করলো। তিনি বললেন, আমি ওযাইর, আল্লাহ তাআলা আমাকে একশ বছর মৃত রেখেছিলেন, পুনরায় জীবিত করেছেন। বৃদ্ধা বললো, ওযাইর তো মুস্তাজা বুদ। অর্থাৎ ওনার দুআ বিফল হতো না, যে দুআ করতেন, সেটা কবুল হয়ে যেত। আপনি যদি ওযাইর হয়ে থাকেন, তাহলে আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসার জন্য দুআ করুন যেন আমি নিজের চোখে আপনাকে দেখি।

তিনি দুআ করার সাথে সাথে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। অতঃপর তিনি ওর হাত ধরে বললেন আল্লাহর হুকুমে দাঁড়াও। এটা বলার সাথে সাথে পাদ্বয়ও সচল হয়ে গেল। সে তাঁকে দেখে চিনতে পারলো এবং বললো, আমি দৃঢ় ভাবে বলছি, আপনি নিশ্চয়ই ওযাইর। এরপর সে তাঁকে ঘরের ভিতর নিয়ে গেল। তখন ঘরে এক বৈঠক চলছিল, উক্ত বৈঠকে তাঁর এক সন্তানও ছিলেন। যার বয়স হয়েছিল একশ আঠার। উক্ত বৈঠকে তাঁর কয়েকজন নাতিও ছিলেন তাঁরাও বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। বৃদ্ধা সেখানে গিয়ে বললেন, এ দেখুন, হযরত ওযাইর এসেছেন। উপস্থিত সবাই বললেন, কিছুতেই হতে পারে না। বৃদ্ধা বললো, আমার দিকে তাকান, আমি তাঁর দুআর বদৌলতে একেবারে সুস্থ ও দৃষ্টিশত্তি সম্পন্ন হয়ে গেছি। তখন ওনারা সবাই তাঁর কাছে আসলেন এবং তাঁর বড় ছেলে বললেন, আমার আব্বাজানের দু'কাধের মাঝখানে নতুন চাঁদের আকৃতিতে কাল পশম ছিল। কাপড় খুলে দেখা গেল যে ঠিকই সেটা মওজুদ আছে। (কুরআন করীম ৩ পারা ৩ আয়াত, খাযায়েনুল এরফান ৬৫ পৃঃ)

সবক: আল্লাহ তাআলার নাফরমানীর একটি পরিনাম এটাও যে, ওদের উপর জালিম শাসক চাপিয়ে দেয়া হয় এবং দেশ ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বড় কুদরতের মালিক, তিনি যা চান তা করতে পারেন। এক দিন সবাইকে জীবিত করে তাঁর দরবারে ডাকবেন এবং কৃতকর্মের হিসেব নিবেন। নবীর শরীর মৃত্যুর পরেও অবিকল থাকে। তবে যে গাধা, সে মরে মাঠির সাথে মিশে যায় এবং মাঠি হয়ে যায়।

কাহিনী নং-৬১
হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও চারটি পাখী—
হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম একদিন সমুদ্রের কিনারে একটি মরা মানুষ দেখলেন। তিনি দেখলেন যে সমুদ্রের মৎস্যকূল লাশটি খাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল যে কয়েকটি পাখী এসে লাশটি খেতে লাগলো। এর কিছুক্ষন পর আবার দেখাইসলামের বাস্তব কাহিনী ৫৬

গেল যে বনের কিছু হিংস্র প্রাণী এসে সেই লাশটি খেতে লাগলো। তিনি এ দৃশ্য দেখে তাঁর মনে মৃতকে জীবিত করার দৃশ্যটা দেখার দরুন আগ্রহ সৃষ্টি হয়। অতএব তিনি আল্লাহর কাছে আরয করলেন, হে আল্লাহ! আমার বিশ্বাস আছে যে আপনি মৃতদেরকে জীবিত করবেন এবং ওদের অংগ প্রত্যংগ সামুদ্রিক প্রাণী, পশু পাখীর পেট থেকে সংগ্রহ করবেন। কিন্তু আমি এ আজব দৃশ্য দেখার জন্য একান্ত আরজু করছি। আল্লাহ তাআলা ফরমারেন, হে খলীল, ঠিক আছে, তুমি চারিটি পাখী নিয়ে নিজের কাছে রেখো, যাতে এগুলোকে ভাল মতে চিনতে পার। অতঃপর এগুলোকে জবেহ করে এগুলোর অংগপ্রত্যংগগুলো একত্রে মিশায়ে ওগুলোর এক এক অংশ এক এক পাহাড়ে রেখে দাও এবং ওগুলোকে আহবান কর। তখন দেখবে, ওগুলো কিভাবে জীবিত হয়ে তোমার কাছে দৌড়ায়ে আসবে।

সে মতে হযরত ইব্রাহীম' (আলাইহিস সালাম) একটি ময়ূর, একটি কবুতর, একটি মোরগ ও একটি কাক-এ চারটি পাখী সংগ্রহ করে জবেহ করলেন। অতঃপর ওগুলোর পালক উঠায়ে ওগুলোকে ছোট ছোট টুকরা করে সব মিশায়ে কয়েক ভাগ করে এক এক ভাগ এক এক পাহাড়ে রেখে দিলেন এবং মাথাগুলো নিজের কাছে রাখবেন। অতঃপর তিনি বললেন, চলে এসো, তাঁর বলার সাথে সাথে ও সমস্ত মিশ্রিত অংশগুলো উড়ে এসে পূর্ববৎ পাখীর আকৃতি ধারণ করে স্বীয় পায়ে দৌড়ায়ে উপস্থিত হলো এবং নিজ নিজ মাথার সাখে সংযুক্ত হয়ে অবিকল আগের মত পূর্ণাঙ্গ পাখী হয়ে উড়ে গেল। (কুরআন করীম: ৩ পারা, খাযায়েনুল এরফান ৬৬ পৃঃ)

সবক : আল্লাহ তাআলা বড় কুদরত ও শক্তির মালিক। কেউ ডুবে মারা গেল এবং ওকে মাছে খেয়ে ফেললো, বা কেউ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বা কাউকে পাখী এবং সামুদ্রিক মাছ অল্প অল্প করে খেয়ে ফেললো এবং ওর অংগ প্রত্যঙ্গ বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল, আল্লাহ তাআলা এরপরও ওর সব কিছু সংগ্রহ করে নিশ্চয় জীবিত করবেন। আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেয়ার থেকে পালানোর কোন সুযোগ নেই। মৃতরা শুনে। তা নাহলে আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহীমকে এটা বলতেন না, টুকরা টুকরাকৃত পাখীগুলোকে ডাক। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর নির্দেশে সেই মৃত পাখীগুলোকে ডাকলেন এবং সেই মৃত পাখীগুলো তাঁর আওয়াজ শুনে দৌড়ে আসলো। এটা হলো পাখীর শ্রবন শক্তি কিন্তু যারা আল্লাহওয়ালা ওদের শ্রবন শক্তি কতটুকু হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওসব পাখীগুলোকে জীবিত তো আল্লাহ তাআলা করেছেন, কিন্তু এ জিন্দেগী ওরা লাভ করেছে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের আহবান ও মুখ নাড়ারইসলামের বাস্তব কাহিনী ৫৭

দ্বারা। আল্লাহ ওয়ালাগণের মুখ নাড়াতেই আল্লাহ উদ্দেশ্য পূর্ণ করে দেন। এজন্য মুসলমানগণ আল্লাহ ওয়ালাগণের কাছে যায় যেন ওনাদের মুবারক ও অকাট্য দুআ দ্বারা মকচুদ পূর্ণ করেন।

কাহিনী নং- ৬২

হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের কুঠার—
হযরত ইব্রাহীম আলাইসিস সালাম যখন জন্ম গ্রহণ করেন, তখন নমরুদের যুগ ছিল এবং মূর্তি পূজার খুবই প্রসার ছিল। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম একদিন ওসব অগ্নি উপাসকদের বললেন, তোমাদের এটা কি ধরণের আচরণ যে, এসব মূর্তিদের সামনে মাথানত করে থাক। এরা তো উপাসনার উপযুক্ত নয়। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই উপসনার উপযোগী। ওসব লোকেরা বললো, আমাদের বাপ-দাদাদের যুগ থেকে এ সব মূর্তিদের পূজা হয়ে আসতেছে। কিন্তু এখন তুমি এমন এক লোক সৃষ্টি হলে যে, ওসব মূর্তিদের পূজা থেকে বাঁধা দিচ্ছ। তিনি বললেন, তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা সবাই গুমরাহ। আমি যা বলছি, তাই হচ্ছে হক কথা। তোমরা ও জমীন-আসমানের মধ্যে যা কিছু আছে, সবের প্রভু তিনি, যিনি এসবগুলোকে সৃষ্টি করেছেন। জেনে রেখো, আমি খোদার কসম করে বলছি, তোমাদের এসব মূর্তিদেরকে আমি দেখে নিব।
ঠিকই একদিন যখন মূর্তি পূজারীরা সবাই তাদের বার্ষিক এক মেলা উপলক্ষে শহরের বাইরে জংগলে গেল, তখন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ওদের মূর্তিঘরে ঢুকে কুঠার দ্বারা সব মূর্তি ভেঙ্গে ফেললেন কিন্তু বড় মূর্তিটা ভাংলেন না, ওটার কাঁধের উপর কুঠারটা রেখে দিলেন। ওরা মেলা থেকে ফিরে এসে মূর্তিঘরে গিয়ে দেখলো যে তাদের দেবতাদের বেহাল অবস্থা। কোনটা ভেঙ্গে চুরে পড়ে রয়েছে। কোনটার হাত নেই। কোনটার নাক নেই, কোনটার চোখ উপড়ায়ে ফেলা হয়েছে। কোনটার পা উদাও হয়ে গেছে। এ অবস্থা দেখে তারা হতভম্ব হয়ে গেল এবং বলতে লাগলো, কোন্ জালিম আমাদের দেবতাদের এ অবস্থা করলো?

এ খবর নমরুদ ও ওর উজির নাজিরদের কানে পৌঁছলো এবং সরকারীভাবে এর তদন্ত হতে লাগলো। লোকেরা বললো, ইব্রাহীম এসব মূর্তিগুলোর বিরুদ্ধে অনেক কিছু বলে, মনে হয় সেই এ কাজ করেছে। সুতরাং হযরত ইব্রাহীমকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হলো, আমাদের দেবতাদের সাথে এ আচরন কি তুমি করেছ? তিনি বললেন, ঐ যে বড় মূর্তিটা যেটার কাঁধে কুঠার রয়েছে তা দেখে অনুমান করা যায় যে, এটা কার কাজ। তাই আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছ? ওকে জিজ্ঞেস করতে পার। ওরা বললো, সেটাতো কথা বলতে পারে না। এ সুযোগে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, যখন তোমরা নিজেরাই স্বীকার করতেছ যে, ওটা কথা বলতে পারে না, তাহলে ধিক্কার তোমরা অথর্বদের প্রতি ও তোমাদের দেবতাদের প্রতি, যাদের তোমরা পূজা কর। (কুরআন ১৭ পারা,, ৫ আয়াত)

সবক : আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তি পূজা করা শিরক। কুরআন মজীদের যেখানে (আল্লাহ ব্যতীত) শব্দ আছে, ওখানে এ মুর্তিদের বুঝানো হয়েছে, নবীও ওলীগণকে বুঝানো হয়নি। এ জন্য ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম, ওগুলোর প্রতি ধিক্কার বলছেন। যদি (আল্লাহ ব্যতীত) দ্বারা নবী ওলী বুঝানো হতো, তাহলে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এ রকম বলতেন না।

কাহিনী নং- ৬৩
হযরত ইব্রাহীম খলীলের সাথে নমরুদের বিতর্ক—
হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম যখন নমরুদকে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আহবান জানালেন, তখন ইব্রাহীম ও নমরুদের মধ্যে নিম্নের বিতর্ক হয়েছিলঃ
নমরুদ : কে তোমার আল্লাহ, যার ইবাদত করার জন্য তুমি আমাকে বলছ?
হযরত খলীল আলাইহিস সালাম: তিনিই আমার আল্লাহ, যিনি জীবিতও করেন এবং মেরেও ফেলেন।

নমরুদ: এ যোগ্যতাতো আমারও আছে। এখনই আমি জীবিত করে দেখাচ্ছি এবং মেরেও দেখাচ্ছি। এ বলে নমরুদ দুজন ব্যক্তিকে ডাকলো, ওদের একজনকে হত্যা করে ফেললো এবং অপরজনকে ছেড়ে দিল। অতঃপর বলতে লাগলো, দেখ, একজনকে আমি মেরে ফেলেছি এবং অপর জনকে গ্রেপ্তার করে ছেড়ে দিয়েছি, যেন ওকে জীবিত করে দিয়েছি। নমরুদের এ বোকামীপূর্ণ কথা শুনে হযরত ইব্রাহীম অন্যভাবে তর্ক শুরু করলেন। তিনি বললেন:
হযরত খলীল আলাইহিস সালাম: আমার আল্লাহ সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। তোমার কাছে যদি কোন ক্ষমতা থাকে, তাহলে তুমি পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখাও।

একথা শুনে নমরুদের নাভিশ্বাস উঠলো এবং লা-জবাব হয়ে গেল। (কুরআন ৩ পারা ৩ আয়াত)

সবক: মিথ্যা দাবীর পরিণতি হচ্ছে জিল্লতী ও অপদস্থ। কাফির চরম বোকা হয়ে থাকে।

কাহিনী নং-৬৪
নমরুদের অগ্নিকুন্ড—
অভিশপ্ত নমরুদ হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে বির্তকে যখন পরাজিত হলো, তখন আর কিছু করতে না পেরে হযরতের জানের দুশমন হয়ে গেল এবং তাঁকে বন্দী করে ফেললো, অতঃপর চার দেয়ালের এক কাঠামো তৈরী করে ওখানে নানা ধরনের লাকড়ীর স্তূপ করলো এবং আগুন জ্বালিয়ে দিল, যার উত্তাপে আকাশে উড়ন্ত পাখী জ্বলে যেত। এরপর একটি নিক্ষেপন হাতিয়ার তৈরী করলো, ওটার সাথে হযরত ইব্রাহীমকে বেঁধে আগুনে নিক্ষেপ করলো। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মুখে তখন এ কলেমা জারী ছিল। (حَشْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ )
আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি উত্তম কার্য নির্বাহক)

এদিকে নমরুদ হযরত ইব্রাহীমকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করলো, ওদিকে আল্লাহ তাআলা আগুনকে নির্দেশ করলেন, হে আগুন, খবরদার! আমার খলীলকে জালিওনা। তুমি আমার ইব্রাহীমের জন্য ঠান্ডা হয়ে যাও এবং নিরাপত্তার আবাসস্থল হয়ে যাও। ফলে সেই আগুন হযরত ইব্রাহীমের জন্য বাগানে পরিণত হয়ে গেল। (কুরআন ১৭ পারা, ৫ আয়াত, খাযায়েনুল এরফান ৪৬৩ পৃঃ)

সবক : আল্লাহ ওয়ালাগণকে শত্রুরা সব সময় কোনঠাসা করতে চেষ্টা করে। কিন্তু ওদের কোন ক্ষতি করতে পারে না ববং নিজেরাই নাজেহাল হয়ে থাকে।

কাহিনী নং-৬৫
হযরত ইব্রাহীম খলীল ও জিব্রাইল—
নমরুদ যখন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে আগুনে নিক্ষেপ করার মনস্থ করলো, তখন হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম উপস্থিত হলেন এবং আরয করলেন, হুযূর! আল্লাহকে বলুন, তিনি যেন আপনাকে অগ্নিকুন্ড থেকে রক্ষা করেন। তিনি বললেন, নিছক শরীরের জন্য এত বড় মহা শক্তিশালী পবিত্র সত্ত্বার কাছে এ সামান্য বিষয়ে প্রার্থনা করবো? হযরত জিব্রাইল আরয করলেন, তাহলে আপনার আত্মাকে রক্ষা করার জন্য বলুন। তিনি বললেন, এ আত্মা ওনার জন্য। তিনি নিজের জিনিসের সাথে যা ইচ্ছে আচরণ করতে পারেন। হযরত জিব্রাইল আরয করলেন, হুযূর! আপনি এত উত্তপ্ত আগুন থেকে কেন ভয় পাচ্ছেন না?
ফরমালেন, হে জিব্রাইল এ আগুন কে জ্বালালো? জিব্রাইল জবাব দিলেন, নমরুদ। তিনি ফরমালেন, নমরুদকে এ ধারণাটা কে দিলেন? জিব্রাইল জবাব দিলেন, মহান আল্লাহ। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, তাহলে তো ঠিকই আছে। একদিকে আল্লাহ জল্লা জলালুহুর নির্দেশ, অন্যদিকে ইব্রাহীম খলীলের রেজাবন্দী। (নযহাতুল মাজালিস- ১০৪ পৃঃ ২ জিঃ)

সবক: আল্লাহ ওয়ালারা সব সময় আল্লাহর ইচ্ছায় সন্তুষ্ট থাকেন।

কাহিনী নং- ৬৬
হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালামের পরিশ্রম—

হুযুর (সল্লল্লাহ আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একবার জিব্রাইল আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে জিব্রাইল! তোমাকে কি কোন সময় খুব দ্রুত গতিতে আসমান থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করতে হয়েছিল? জিব্রাইল জবাব দিলেন, হ্যাঁ, ইয়া রসূলুল্লাহ! চার বার এ রকম হয়েছে; খুবই দ্রুত গতিতে আমাকে পৃথিবীতে অবতরণ করতে হয়েছিল।

হুযূর (সল্লল্লাহ আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, কোন্ কোন্ অবস্থায় সেই চার বার অবতরণ করতে হয়েছিল?

জিব্রাইল আরয করলেন, প্রথমবার, যখন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন আমি আরশের নিচে ছিলাম। আমাকে আল্লাহ নির্দেশ দিলেন, জিব্রাইল, আমার খলীল আগুনে পতিত হওয়ার আগে তুমি এক্ষুনি তথায় পৌঁছে যাও। তখন আমি খুবই দ্রুত গতিতে হযরত ইব্রাহীম আলাইসিস সালামের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম।

দ্বিতীয়বার, যখন হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের পবিত্র গলার উপর ছুরি বসানো হলো, তখন আমাকে নির্দেশ দেয়া হলো ছুরি চালনার আগে পৃথিবীতে পৌঁছে যাও এবং ছুরি উল্টায়ে দাও। নির্দেশমত আমি ছুরি চালনার আগে পৃথিবীতে পৌঁছে গিয়েছিলাম এবং ছুরি চালাতে দি নাই।

তৃতীয়বার, যখন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে ওনার ভাইয়েরা কূপে ফেলে দিলেন, তখন আমাকে হুকুম করা হলো, ইউসুফ আলাইহিস সালাম কুপের তলায় পৌছার আগেই যেন আমি পৃথিবীতে পৌঁছে যাই এবং কূপ থেকে একটি পাথর বের করে ওটার উপর ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যেন আরামে বসায়ে দি। নির্দেশমত আমি সেরকমই করেছিলাম।

চতুর্থবার, ইয়া রসুলুল্লাহ! যখন কাফিরেরা আপনার দাঁত মুবারক শহীদ করলেন, তখন আমার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো, আমি যেন এক্ষুনি পৃথিবীতে অবতরণ করি এবং হুযুরের দাত মুবারকের পবিত্র রক্ত যেন মাটিতে পড়ার আগেই স্বীয় হাতে নিয়েনি। ইয়া রসুলল্লাহ! আল্লাহ তাআলা আমাকে বলেছিলেন, জিব্রাইল! আমার মাহবুবের এ রক্ত যদি মাটিতে পতিত হয়, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে কোন সবজি উৎপন্ন হবে না এবং কোন বৃক্ষ জন্মাবে না। তাই আমি খুবই দ্রুত গতিতে পৃথিবীতে পৌছেছি এবং হুযুরের পবিত্র রক্ত নিজ হাতে নিয়ে নিয়েছি। (রুহুল বয়ান ৪১১পৃঃ ৩ জিঃ)

সবক: নবীগণের শান অনেক উর্ধে। জিব্রাইল আমীনও ওনাদের খাদেম। আল্লাহ ওয়ালারা কোটি কোটি মাইল দূরত্বের পথ এক পলকে অতিক্রম করতে পারেন।

কাহিনী নং-৬৭
ছেলে কুরবানী—
হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এক রাত্রে স্বপ্ন দেখলেন, কোন ব্যক্তি অদৃশ্য থেকে আওয়াজ করে বলছে, হে ইব্রাহীম! আপনার উপর আল্লাহর নির্দেশ হয়েছে, নিজ সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় জবেহ করে দিন। যেহেতু নবীগণের স্বপ্ন সঠিক ও ওহী সদৃশ হয়ে থাকে, সেহেতু তিনি তাঁর প্রিয় সন্তান হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পথে কুরবানী করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন।

হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তখন অল্প বয়স্ক ছিলেন বিধায় তাঁকে শুধু এতটুকু বলেছেন, বেটা, রশি ও ছুরি নিয়ে আমার সাথে চলো; এ বলে স্বীয় সন্তানকে নিয়ে তিনি এক জংগলে পৌছলেন। হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, আব্বাজান! আপনি এ ছুরি ও রশি নিয়ে কেন এসেছেন? তিনি ফরমালেন, সামনে গিয়ে একটি কুরবানী দিব। কিছু দূর গিয়ে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সরাসরি বলে দিলেন, বেটা! আমি তোমাকেই আল্লাহর পথে জবেহ করার জন্য এখানে এসেছি। আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আেমাকে জবেহ করতেছি। বেটা, এটা আল্লাহর ইচ্ছা। বল, তোমার ইচ্ছা কি? হযরত ইসমাঈল জবাব দিলেন: আব্বাজন, যখন এটা আল্লাহর ইচ্ছা, তখন আমার ইচ্ছার প্রশ্নই উঠে না। আপনার প্রতি যেটা নির্দেশ হয়েছে, সেটা পালন করুন। ইনশা আল্লাহ আমি ধৈর্য ধারণ করবো। ছেলের এ সাহসিকতাপূর্ণ জবাব শুনে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম খুবই সন্তুষ্ট হলেন এবং স্বীয় সন্তানকে আল্লাহ পথে জবেহ করার জন্য তৈরী হয়ে গেলেন। পিতা যখন সন্তানকে শোয়ায়ে গলায় ছুরি চালালেন, তখন ছুরি হযরত ইসমাইলের গলা মোটেই কাটলো না। তিনি যখন আরও জোরে ছুরি চালাতে লাগলেন, তখন গায়েবী আওয়াজ আসলো-আর না হে ইব্রাহীম! তুমি আল্লাহর নির্দেশ পালন করেছ এবং এ কঠিন পরীক্ষায় পারিপূর্ণভাবে কামিয়াব হয়েছ। তিনি মাখা ফিরায়ে দেখলেন একটি দুম্বা পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং তাঁকে বলাছেন, জনাব ইসমাঈলের স্থলে আমাকে জবেহ করুন এবং ওনাকে সরিয়ে দিন। অতএব হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সেই দুম্বাকে জবেহ করলেন এবং হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উঠে বসলেন এবং মহা পরীক্ষায় বাপ-বেটা উভয়ে কামিয়াব হলেন। (কুরআন ২৩ পারা, ৭ আয়াত ও তফসীর গ্রন্থসমূহ)

সবক: আল্লাহ ওয়ালাগণ আল্লাহর রাস্তায় সব কিছু কুরবানী করতে প্রস্তুত থাকেন। এমনকি নিজ সন্তানকেও কুরবানী করতে দ্বিধাবোধ করেন না। কিন্তু আজকাল যারা আল্লাহর রাস্তায় একটি ছাগল জবেহ করতে নানা রকম তালবাহনা করে, আল্লাহর সাথে তাদের কিবা সম্পর্ক?

কাহিনী নং- ৬৮
ফেরাউনের স্বপ্ন—
ফেরাউন একবার সপ্নে দেখল যে, ওর সিংহাসন উপুড় হয়ে পড়ে গেল। সে ভবিষ্যদ্বক্তাদের কাছে এর তাবীর জিজ্ঞেস করলো। ওরা বললো, এমন এক শিশুর জন্ম হবে, যে আপনার রাজত্বের পতনের কারণ হবে। ফেরাউন এ কথায় খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লো এবং নবজাতক নিধন করতে শুরু করলো। কারো ঘরে শিশু জন্ম হলেই নিধন করাতো। হযরত মূছা আলাইহিস সালাম যখন জন্ম নিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা মূছা আলাইহিস সালামের মায়ের মনে এ ধারণাটা দিলেন যে, ওকে দুধপান করাও এবং কোন বিপদ দেখলে ওকে নদীতে ফেলে দিও। সেমতে মূসা আলাইহিস সালামের মা কয়েক দিন দুধ পান করালেন। এ সময় তিনি কাঁদতেন না এবং কোলে নড়াছড়াও করতেন না এবং তাঁর বোন ছাড়া অন্য কেউ তাঁর জন্মের খবর জানতো না। এভাবে তিন মাস অতিবাহিত হবার পর মূসা আলাইহিস সালামের মা কিছুটা বিপদের আশংকা করলো। তখন আল্লাহ তাআলা ওনার মনে এ ধারণাটা দিলেন, এখন মূসা আলাইহিস সালামকে একটি সিন্দুকে ভরে সমুদ্রে ফেলে দাও এবং কোন চিন্তা করো না। আমি ওকে পুনরায় তোমার কোলে ফিরায়ে দেব। সে মতে একটি বড় সিন্দুক তৈরী করলেন এবং ওটাতে তুলা বিছায়ে এর উপর মূসা আলাইহিস সালামকে রেখে সিন্দুক বন্ধ করে দিলেন। অতঃপর এ সিন্দুকটি নিল নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। এ নদীর একটি বড় শাখা ফেরাউনের শাহী মহলের পাশ দিয়ে প্রবাহমান ছিল। ফেরাউন স্বীয় বিবি আসিয়াকে সাথে নিয়ে নদীর তীরে বসা ছিল, এ সময় একটি সিন্দুক ভেসে আসতে দেখলো। তখন সে দাস-দাসীদেরকে সিন্দুকটি ধরার জন্য বললো। সিন্দুকটি ধরে কুলে উঠায়ে তার সামনে নিয়ে আসলো এবং খোলার পর দেখা গেল যে, সেখানে এক নূরানী আকৃতির শিশু রয়েছে, যার চেহারা মুবারকে সৌন্দর্য ও সৌভাগ্যের লক্ষ্মণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। দেখা মাত্রই ফেরাউনের মনে শিশুটির প্রতি দারুন মহব্বত সৃষ্টি হলো এবং খুবই আকৃষ্ট হয়ে পড়লো। কিন্তু ওর কউমের লোকেরা ওকে স্মরণ করায়ে দিল যে এটা সেই শিশুও হতে পারে, যে আপনার রাজত্ব ধ্বংস করে দিবে। এ কথা শুনে ফেরাউন ওকে হত্যার জন্য প্রস্তুত হলো। তখন ফেরাউনের স্ত্রী- বিবি আসিয়া, যিনি বড় নেক্কার মহিলা ছিলেন, বলতে লাগলেন-এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমনি। ওকে হত্যা কর না! এ কোন্ মুল্লুক থেকে ভেসে এসেছে তার কোন পাত্তা নেই। যে শিশুর বাপারে তুমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, সেটাতো এ দেশের বনী ইসরাইলের বংশোদ্ভূত বলা হয়েছে। আসিয়ার এ কথা ফেরাউন মেনে নিল এবং ফেরাউনের ঘরেই মূসা আলাইহিস সালাম লালিত পালিত হতে লাগলো। ওনাকে দুধ পান করানোর জন্য অনেক ধাত্রী আনা হলো। কিন্তু তিনি কারো দুধ পান করেন না। এতে ফেরাউন মহা চিন্তায় পড়লো, এমন একজন ধাত্রী পাওয়া যেত, যার দুধ পান করতো।

এদিকে মূসা আলাইহিস সালামের মা শিশুর বিচ্ছেদে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। এবং মূসা আলাইহিস সালামের বোন, যার নাম ছিল মরিয়াম, সিন্দুক কোথায় গেল, মূসা কার হাতে পড়লো, সেটার সন্ধানে নিল। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো, মূসা একেবারে ফেরাউনের ঘরে পৌঁছে গেছে এবং ওখানে লালিত পালিত হচ্ছে। এটাও জানতে পারলো যে মূসা কোন ধাত্রীর দুধ পান করছেনা। সুযোগ বুঝে সে ফেরাউনের কাছে গিয়ে বললো, আমি আপনাকে এমন একজন ধাত্রীর খরব দিতে পারি, যার দুধ এ শিশু নিশ্চয় পান করবে। ফেরাউন বললো, নিশ্চয়ই, আমি তো এ রকম ধাত্রীর খোঁজে আছি। অতএব সে ফেরাউনের একান্ত আগ্রহে ওর মাকে ডেকে আনলো, মূসা আলাইহিস সালাম তখন ফেরাউনের কোলে ছিল এবং দুধ পান করার জন্য কাঁদছিলেন। ফেরাউন ওনাকে শান্ত করার জন্য চেষ্টা করছিল। মায়ের গন্ধ পাওয়ার সাথে সাথে শান্ত হয়ে গেলেন এবং মায়ের দুধ পান করতে লাগলেন। ফেরাউন জিজ্ঞেস করলো, তুমি এ শিশুর কে? কোন ধাত্রীর দুধ সে পান করলো না কিন্তু তোমারটা সাথে সাথে পান করলো। তিনি বললেন, আমি একজন পবিত্র মহিলা, আমার দুধ সুস্বাদু। যে সব শিশুর মানসিকতা পবিত্র হয়, ওরা অন্য মহিলাদের দুধ পান করে না, আমার দুধই পান করে। ফেরাউন শিশুটা ওকে দিয়ে দিল এবং ধাত্রী হিসেবে ওকে নিয়োগ করে শিশুকে ওর ঘরে নিয়ে যেতে অনুমতি দিল। সেমতে মূসা আলাইহিস সালামকে ঘরে নিয়ে আসলেন এবং আল্লাহ তাআলার সেই ওয়াদাটা পূর্ণ হয়ে গেল-'আমি ওকে তোমার কোলে ফিরিয়ে দেব'। এভাবে মূসা আলাইহিস সালামের লালন-পালন ফেরাউনেরই মাধ্যমে হতে লাগলো। দুধ পান করার সময় কালটা ওনার মায়ের কাছেই রইলেন এবং ফেরাউন পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতিদিন একটি করে স্বর্ণমুদ্রা দিতে থাকল। দুধ ছাড়ার পর মূসা আলাইহিস সালামকে ফেরাউনের রাজ প্রাসাদে নিয়ে আসলো এবং তথায় লালিত পালিত হতে লাগলো। (কুরআন করীম ১৬ পারা ১১ আয়াত, ২০ পারা ৪ আয়াত, খাযায়েনুল এরফান ৪০৪, ৫৪৪ পৃঃ)

সবক : আল্লাহ তাআলা বড় কুদরত ও ক্ষমতার অধিকারী। মূসা আলাইহিস সালামকে স্বয়ং ফেরাউনের ঘরে রেখেই লালন পালনের ব্যবস্থা করলেন। মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর শৈশবে অন্য কোন ধাত্রীর দুধ পান না করে বরং নিজের মাকে সনাক্ত করে ওনার দুধ পান করে এটা প্রমাণিত করলেন যে নবী শৈশবকালেও এ ধরণের জ্ঞান বুদ্ধি রাখেন, যা সাধারণ লোকদের মধ্যে থাকে না। নবীগণকে নিজেদের মত মানুষ ধারণাকারীদের কাউকে যদি শৈশবকালে কুকুরের দুধ পান করতে দেয়া হতো, তাহলে নিশ্চয় খেয়ে ফেলতো। কিন্তু নবীর শান দেখুন, তিনি শৈশবে তাঁর মায়ের দুধ ভিন্ন অন্য কোন মহিলার দুধও পান করেননি। তাই নবীকে আমাদের মত মানুষ মনে করাটা বড় মূর্খতার পরিচায়ক।

কাহিনী নং- ৬৯
ফেরাউনের মেয়ে—
ফেরাউনের এক মেয়ে ছিল, যার শ্বেতী রোগ হয়েছিল। ফেরাউন বড় বড় ডাক্তার দ্বারা ওর চিকিৎসা করালো কিন্তু কোন ফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যদ্বক্তাদের কাছে ওর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। ওরা বললো, এর আরোগ্য লাভ নদী থেকে পাওয়া যাবে। ঠিকই তাই হয়েছে। একদিন ফেরাউন তার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে নদীর তীরে বসেছিল। তখন হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সিন্দুকটা ভেসে আসছিল। যখন এ সিন্দুকটা ফেরাউনের সামনে আনা হলো ও খোলা হলো, তখন মূসা আলাইহিস সালামকে দেখলো, তিনি স্বীয় আঙ্গুল চুষছিলেন। ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার মনে মুসা আলাইহিস সালামের প্রতি খুবই মায়া হলো, তিনি ওকে উঠায়ে নিলেন। ফেরাউনের মেয়ের মনেও এ নুরানী শিশুর প্রতি খুবই মায়া হলো। সে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মুখের থুথু মুবারক নিয়ে স্বীয় শরীরে মালিশ করলো। এর ফলে সঙ্গে সঙ্গে ওর শ্বেতী অদৃশ্য হয়ে গেল। (নজহাতুল মাজালিস ২০৮ পৃঃ ২ জিঃ)

সবক : নবীগণের থুথু মুবারকও বালা মছিবত দূরীভূতকারী হয়ে থাকে। তাই যে সব লোকের থুথু বিভিন্ন রোগের মারাত্মক জীবানু ছড়ায়, ওরা ওসব পূণ্যাত্মা মনীষীগণের মত কি করে হতে পারে?

কাহিনী নং- ৭০
মূসা আলাইহিস সালামের ঘুষি—
হযরত মূসা আলাইহিস সালামের বিশ বছর বয়সে একদিন ফেরাউনের ঘর থেকে শহরে বেড়াতে বের হয়েছিলেন। তিনি পথে দু'ব্যক্তিকে পরস্পর ঝগড়া করতে দেখলেন। ওদের একজন ফেরাউনের বাবুর্চি ছিল এবং অপরজন মূসা আলাইহিস সালামের কউম বনী ইসরাইলের লোক ছিল। ফেরাউনের বাবুর্চী লাকড়ীর বোঝাটা লোকটির মাথায় তুলে দিয়ে ফেরাউনের বাবুর্চী খানায় নিয়ে যাবার জন্য চাপ দিচ্ছিল। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ব্যাপারটা উপলব্ধি করে বাবুচীকে বললেন, গরীব লোকটার প্রতি জুলুম করো না। কিন্তু সে কর্ণপাত করলো না বরং গালিগালাজ করতে লাগলো। এতে মূসা আলাইহিস সালামের রাগ এসে গেল এবং ওকে এক ঘুষি মারলেন। সেই ঘুষিতে সে মারা গেল এবং ওখানেই পড়ে রইলো। কুরআন করীম ১০ পারা, ৫ আয়াত, রুহুল বয়ান-৯৬৫ পৃঃ ২ জিঃ)

সবক: নবীগণ মজলুমদের সাহায্যকারী হয়ে তশরীফ এনেছেন। নবীগণ সীরত, সুরত ও শক্তিতে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে থাকেন। হযরত মূসা নবীর ঘুষিটা উল্লেখযোগ্য ছিল। তাই এক ঘুষিতে জালিমের জুলুম বন্ধ হয়ে গেল।

কাহিনী নং- ৭১
মূসা আলাইহিস সালামের চড়—
হযরত মূসা আলাইহিস সালামের কাছে যখন মৃত্যুর ফিরিশতা উপস্থিত হলেন, তখন হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ওকে এমন এক চড় মারলেন যে মৃত্যুর ফিরিশতার চোখ বের হয়ে গেল। মৃত্যুর ফিরিশতা সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়ে আরয করলেন, হে আল্লাহ! আজ আপনি আমাকে আপনার এমন এক বান্দার কাছে পাঠালেন, যিনি মরতে চান না। দেখুন, উনি আমাকে চড় মেরে আমার চোখ বের করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ওর চোখ ঠিক করেদিলেন এবং বললেন, আমার বান্দা মূসার কাছে পুনরায় যাও এবং সাথে একটি ষাঁড় নিয়ে যাও। ওনাকে গিয়ে বল, যদি আরও বেঁচে থাকতে চান, তাহলে এ ষাঁড়ের পিঠের উপর হাত রাখুন। যত লোম আপনার হাতের নিচে পড়বে, তত বছর আপনি জীবিত থাকতে পারবেন। সুতরাং মৃত্যুর ফিরিশতা ষাঁড় নিয়ে হাজির হলেন এবং আরয করলেন, হুযূর আপনি এর পিঠের উপর হাত রাখুন। যত লোম আপনার হাতের নিচে পড়বে, তত বছর আপনি জীবিত থাকতে পারবেন। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, ততবছর পর পুনরায় তুমি হাজির হবে? আরয করলেন, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, তাহলে দরকার নেই, এখনই নিয়ে যাও। (মিশকাত শরীফ ৪৯৯ পৃঃ))

সবক: আল্লাহর নবীগণের এমন শান মান যে, ইচ্ছে করলে মৃত্যুর ফিরিশতাকে চড় মেরে চোখ বের করে ফেলতে পারেন। নবীগণ ওরকম হয়ে থাকেন যে, তাঁরা মৃত্যু বরণের ইচ্ছে করলে মৃত্যুর ফিরিশতা কাছে আসেন আর যদি মৃত্যুবরণ করতে না চান, তাহলে ফিরে চলে যান। অথচ সাধারণ লোকদের জন্ম মৃত্যু আপন গতিতে চলে, কারো খেয়াল খুশীমত হয় না।
--//


No comments:

Post a Comment