জ্ঞান ও ঈমান আকীদা—
📚ম'রেফাত ও দীদার-এ-ইলাহী
✍🏻শায়েখ আলাউদ্দীন খান আল ক্বদমী
জ্ঞান—
অবিনশ্বর সত্যে বিশ্বাস এবং বিষয়কে সঠিক ও যথাযথভাবে জানার নাম জ্ঞান। জ্ঞান সৃষ্ট নয়, কারণ অবিনশ্বর সত্য সৃষ্ট হতে পারে না, যা জানার নাম জ্ঞান। আল্লাহতায়ালা অবিনশ্বর সত্য।আল্লাহতায়ালা তাঁর বাক্যাবলী বা আয়াতসমূহ হতে পৃথক নন। তাই কোরআনও অবিনশ্বর সত্য-যা সৃষ্ট নয়। কোরআন হল স্রষ্টা ও সৃষ্টির অভিব্যক্তি আর বিশ্ব প্রকৃতি কোরআনের অভিব্যক্তি।কোরআন ও বিশ্ব প্রকৃতি আল্লাহতায়ালার জ্ঞান ও গুণের প্রকাশ। কোরআনের সাথে সৃষ্টির সম্মন্ধ আছে, এই সম্মন্ধ থাকাতে আল্লাহতায়ালার জ্ঞান ও গুণ সৃষ্ট হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সৃষ্ট হলেও আল্লাহর রাসূল, তাই তাঁর বাণীও অবিনশ্বর সত্য, যা জানার নাম জ্ঞান।
আল্লাহতায়ালা প্রকাশ্য ও গুপ্ত। এক দিকে তিনি যেমন দৃশ্যমান জড় জগতে প্রকাশিত, তেমনি অদৃশ্যমান নূরী জগতে ব্যাপ্ত। অর্থাৎ সমগ্র দৃশ্যমান জড় ও অদৃশ্য নূরী জগতে স্তরে স্তরে তাঁর জ্ঞান ওগুণরাজী প্রকাশিত করে তাঁর নিরাকার অস্তিত্ব ঘোষণা করছেন। দৃশ্যমান জড়জগতে যেমন তিনি তাঁর জ্ঞান ও গুণকে প্রকাশ করে তাঁর নিরাকার সত্তার প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন, তেমনি অদৃশ্য নূরীজগতেও তাঁর উপস্থিতি প্রকট করে তাঁর নিরাকার সত্তা যে দেহধারী নয়, অথচ অস্তিত্ব সর্বত্র বিরাজমান, এ সত্যই পেশ করেছেন। দৃশ্যমান জড় ও অদৃশ্যমান নূরী জগতে মানুষ, ফিরিশতা ও জিনদের সৃষ্টি করে তাঁর জ্ঞান, গুণ ও ক্ষমতার দ্বারা তাঁর কার্যাবলী মারফত প্রমাণ করছেন যে, দেহধারী না হলেও তাঁর নিরাকার অস্তিত্বই সকল জ্ঞান, গুণ ও ক্ষমতার একমাত্র আধার ও উৎস।জড়জগত জড়ের দ্বারা, নূরী জগত নূরের দ্বারা অস্তিত্ববান হয়েও তাঁর একমাত্র নিরাকার, চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তশীল সত্তায় বিলীন।
দৃশ্যমান বিশ্ব প্রকৃতিতে যেহেতু তাঁর জ্ঞান ও গুণরাজী প্রকাশিত, তাই বিশ্বপ্রকৃতির নিদর্শনাবলীর সাহায্যে আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব ধরা যায়। জড়জগতে বস্তুগুলো যে বস্তু হয়েছে তা অন্য বস্তুর সাহায্যে। একটির অস্তিত্ব অন্যটির ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে, একটির সাহায্যে অন্যটিকে যেমনঅ স্তিত্ববান করা হয়েছে, তেমনি প্রতিটি বস্তুকে পরস্পর সম্মন্ধযুক্ত করে এবং কার্যকারণ সম্মন্ধের শৃংখলে আবদ্ধ করে তাঁর একত্বের তথা তওহীদের প্রমাণ দিয়েছেন।
দৃশ্যমান জড়জগতের প্রতিটি দ্রব্য ও পদার্থ আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট, সেগুলোকে সঠিকভাবে জানা মানে আল্লাহ্তায়ালার জ্ঞান লাভ করা। তাই সমগ্র জ্ঞান স্রষ্টার। স্রষ্টার জ্ঞানের বাইরে কোন জ্ঞান নেই।মানুষ এতে ভুল ও মিথ্যা মিশিয়েছে। বৈজ্ঞানিকগণ প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় আবিষ্কার করে যে জ্ঞানের পরিধি বাড়ায়, সে জ্ঞানে ভুল ও মিথ্যা না থাকলে সেসব জ্ঞানও আল্লাহতায়ালার। সৃষ্টিরাজীর অনুধাবন ও বিশ্ব প্রকৃতির নির্দশনাদির দ্বারা আল্লাহতায়ালার জ্ঞান, ক্ষমতা ও একত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়, সে সবের সাহায্যে স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে জ্ঞান লাভও করা যায়। এ জাতীয় দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত। এরূপ জ্ঞান দ্বারা নিম্ন জগত হতে ঊর্ধ্বজগতে উন্নীত হওয়া যায়। শক্তি জগত পর্যন্ত এ জাতীয় জ্ঞানের পরিধি। ইচ্ছা করলে বৈজ্ঞানিকগণ ও বিজ্ঞান নির্ভর দার্শনিকগণ এ জ্ঞান লাভ করতে পারেন যা আংশিক ও খন্ডিত জ্ঞান, সামগ্রিক নয়।
বস্তুর সাহায্যে নিদর্শনাদি দেখে ও নূরের পরিচয় লাভ করে, নূরে ইলাহীর মাধ্যমে দর্শন ও পর্যবেক্ষণ করে যে জ্ঞান লাভ করা হয় তা ঊর্ধ্ব হতে নিম্নে আগমণ করে এবং নিম্নের জ্ঞানকে ঊর্ধ্বের জ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য ঘটায়। এ জ্ঞান যুক্তি-প্রমাণের চেয়েও এমনকি প্রত্যক্ষ দর্শনের চেয়েও অগ্রবর্তি ও নিশ্চয়াত্মক। নবী-রসূল ও আউলিয়া-ই-কেরাম নূরে ইলাহীর দ্বারাই আল্লাহতায়ালার অখন্ড জ্ঞানলাভ করেন। যে কেউ নূরে ইলাহীর দ্বারা জড় ও নূরী জগতের জ্ঞান লাভ করে আল্লাহতায়ালার নিরাকার সত্তার পরিচয় লাভ করতে পারেন, যদি তিনি স্রষ্টার ভালবাসা লাভে সক্ষম হন। সে ভালবাসা লাভ করতে হলে রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর গুণে নিজেকে গুণান্বিত করতে হবে।
সৃষ্টির আদি উৎসে হাকীকতে মুহাম্মদীর প্রতি আল্লাহতায়ালা তাঁর মুহব্বত এলকা (নিক্ষেপ) করেছিলেন, যা ছিল নূরে মুহাম্মদী ও নূরে আহমদীর মিলিত প্রকাশ। আদেশ মারফত সৃষ্টির এ আদিউৎস সৃষ্টি করে পরবর্তীতে এর মাধ্যমে অদৃশ্য নূরী জগত এবং নূরকে যৌগিক করে দৃশ্যমান জড়জগত সৃষ্টি করেন, ফলে সে মুহব্বত তামাম সৃষ্টিতে ব্যাপ্ত হয়ে যায়। তাই রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও সৃষ্টিকে ভালবাসলে আল্লাহতায়ালার ভালবাসা পাওয়া যায়। সৃষ্টিসহ রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে আল্লাহ্ নির্দেশিত আনুগত্যের মাধ্যমে ভালবাসতে হবে। পরে রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে ভালবাসা স্রষ্টারপ্রতি ভালবাসায় রূপান্তরিত হবে।
দৃশ্যমান জড় প্রকৃতির নিদর্শনাদি, সৃষ্টি ও প্রতিপালন কৌশলের জ্ঞান দ্বারা আল্লাহতায়ালা প্রচ্ছন্ন থেকেও মহাশক্তির দ্বারা যে এ জড়জগত পরিচালিত, তা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে, বহু বিচিত্র সৃষ্টির মধ্যেই তাঁর একত্ব প্রমাণিত হচ্ছে। জড় বস্তু নূরী স্তরের দ্বারা যৌগিকত্বের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছে। নূরী স্তরচর্ম চোখে দেখা যায় না। তিনি যে জাহের ও বাতেনে বা অদৃশ্য জগতে আছেন বুঝা যায়।
জড়জ্ঞান খন্ডিত জ্ঞান। খন্ডিত জ্ঞান দ্বারা অখন্ড জ্ঞান আয়ত্ত্বে আসতে পারে না। কারণ খন্ড, অখন্ডকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। ফলে জড় জ্ঞানীদের কাছে এক মহাশক্তি রূপে আল্লাহ্তায়ালার অস্তিত্ব আবিষ্কৃত ও প্রমাণিত হলেও তাঁর আসল স্বরূপ বুঝতে ও জানতে পারে না। অবশ্য জড়জগতের বস্ত বা বিষয় গুলিকে সঠিকভাবে জানলে তা কোরআনের অনুগামী হয়। এর কারণ বিশ্বপ্রকৃতি আল্লাহতায়ালার কার্য, তাঁর কার্যাবলী নিঃসন্দেহে তাঁর বাক্যাবলীর অনুগামী হবে।
অখন্ড সামগ্রিক জ্ঞান অর্জন করতে হলে পঞ্চমইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের বাইরে অদৃশ্য জগতকে বিশ্বাস করতে হবে। আর অদৃশ্যে বিশ্বাসের নামই ঈমান।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,– "যারা শাশ্বতবাণীতে বিশ্বাসী, তাদের আল্লাহ্ ইহজীবনে ও পরজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যারা জালিম আল্লাহ্ তাদের বিভ্রান্তিতে রাখবেন।” আল কুরআন ১৪:২৭।
আল্লাহতায়ালার বাণী কোরআন আর রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এরবাণী হাদীস শাশ্বতবাণী। এ বাণী বা বাক্যাবলীতে বিশ্বাসীগণকে ঈমানদার বলে। কেবলমাত্র ঈমানদারগণই আল্লাহতায়ালার জড়জগতের প্রকৃতিপুঞ্জ দেখে সেগুলির আদি ও অন্ত জেনে এবং অদৃশ্যে না দেখেও বিশ্বাস করে অখন্ড জ্ঞান লাভ করতে পারে। কারণ তারা বিষয়কে যথাযথভাবে জানতে পারে।
"যারা কুফরী করে তারা মিথ্যার অনুসরণ করে এবং যারা ঈমান আনে তারা তাদের প্রতিপালক প্রেরিত সত্যের অনুসরণ করে।” (৪৭ঃ৩)
জগতে সত্য একমাত্র আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নাযিলকৃত আর সব মিথ্যা বা সত্য মিশ্রিত মিথ্যা-যা অসত্য। যারা সাকুল্য সত্য বা তার সামান্য অংশ-বিশেষ অস্বীকার করে বা স্রষ্টার বিরোধিতা করে তারাই কাফির। যারা সাকুল্য সত্য মেনে নেয় ও সে অনুযায়ী সৎকাজ করে তারা ঈমানদার। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,– "সত্য উহাই যা আপনার প্রতিপালকের নিকট হতে প্রাপ্ত। সুতরাং আপনি সন্দিহানদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।” (২ঃ১৪৭)
📚ম'রেফাত ও দীদার-এ-ইলাহী
✍🏻শায়েখ আলাউদ্দীন খান আল ক্বদমী
ঈমান—
আল্লাহ তায়ালা ও তদীয় রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কথা বিশ্বস্ততার নিরিখে মনে-প্রাণে মেনে নেওয়া ও অদৃশ্য সত্যে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করার নাম ঈমান।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ঈমানদারগণের পরিচয় এভাবে দিয়েছেন- "যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে এবং সালাত কায়েম করে, আর আমি তাদের যে রুয়ী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। এরা যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সে সব বিষয়ের উপর যা কিছু আপনার উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং সে সব বিষয়ের উপর যা আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখিরাতে যারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে। তারাই আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে হেদায়েত প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।” (২ঃ৩-৫)
সালাত বা নামায—
"যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে এবং সালাত কায়েম করে, আর আমি তাদের যে রুয়ী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। এরা যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সে সব বিষয়ের উপর যা কিছু আপনার উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং সে সব বিষয়ের উপর যা আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখিরাতে যারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে। তারাই আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে হেদায়েত প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।” (বাকারা : ৩-৫)
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালার সংজ্ঞা অনুযায়ী নামায কায়েমকে অত্যন্ত জরুরী ভিত্তিতে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সূফী দরবেশদের মধ্যে যারা নামায কায়েম করবে না তারা নিঃসন্দেহে ঈমানদার নয়। এ হিসাবে তারা নিজেদের সূফী বলে দাবী করতে পারে না, দাবী করলেও তা অসার হবে। যারা তাদের সূফী বলে মনে করবে তারাও পথভ্রষ্ট।
কাফেরকেও আল্লাহতায়ালা দুনিয়াতে ধন-দওলত দান করেন। তার ভাল কাজের পুরস্কার ইহকালেই দান করেন। সেরূপ কোন বেনামাযী সূফী নামধারী ব্যক্তি যদি তরকে দুনিয়া হয়ে সব সময় আল্লাহতায়ালার যিকির করে তবে আল্লাহতায়ালার আইন অনুযায়ী তার অন্তরচোখ হয়ত খুলতেপারে, ইস্তিদরাজও হয়ত জাহির হতে পারে, তবে তা হবে তার দুনিয়ার প্রাপ্য। আখিরাতে তার শাস্তি পাওয়ার আশংকাই বেশী। দুনিয়াতে সে প্রথমে হেদায়েতের নূর পাবে, তাতে হেদায়েত না হলে সে নূরও ছিনিয়ে নেবার আশংকা আছে, শয়তানকে তার সাথী করে দেওয়া হবে। সে নেককার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। আগুন, বাতাস, মাটি ও পানির দ্বারা যেসব কালের গঠিত, অন্তরচোখ দ্বারাসেগুলোতেই ঘুরপাক খাবে। শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপের দরুণ, নফস শয়তান তার নূরকে ঢেকেদেবে এবং সে অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
সাবধান! বেনামাযী সূফীর অনুসারী সেজে জাহান্নাম অর্জনের দিকে অগ্রসর হওয়া কারও উচিত নয়।সে যত ইসতিদরাজই (কেরামত) দেখাক না কেন? দজ্জালের কাছে কম ইসতিদরাজ থাকবে না।
[আল্লাহতায়ালার শত্রু বা শরীয়ত বিরোধী ব্যক্তি হতে যে অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশ হয় তাকে ইসতিদরাজ বলে]।
আল্লাহতায়ালা তাঁর দুশমনকে ইহকালে সম্ভ্রান্ত ও পরকালে লাঞ্ছিত করার জন্য তার মনোবাসনা পূর্ণ করে দেন। এতে তাদের অবাধ্যতা, অহংকার ও পাপ বৃদ্ধি পায়। বেনামাযী বেআমল শুধু যিকিরকারী ইসতিদরাজওয়ালা সূফী নামধারী ও তার অনুসারীরা বিভ্রান্ত।
আল্লাহ্তায়ালা আর এক আয়াতে বলছেন- "যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, আর তারাই আখিরাতে নিশ্চিত বিশ্বাসী” (৩১:৪)।
অদৃশ্যে বিশ্বাস—
ঈমানের সাথে সর্ব প্রথম অদৃশ্যে বিশ্বাসকে শর্ত করা হয়েছে। অদৃশ্য সে সকল বিষয় যা কোরআন-সুন্নাহতে আছে। আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব, সত্তা, তাঁর স্বরূপ, গুণাবলী ও তকদীর সংক্রান্ত বিষয়াবলী, বেহেশত, দোযখ, কিয়ামত, হাশর ও হাশরের ঘটনাসমূহ ইত্যাদি যে সকল ঘটনা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, যার ব্যাখ্যা হিসাবে রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করে গেছেন, যা গায়েবের অন্তর্গত। সেগুলোকে বিশ্বাস ও মান্য করার নাম ঈমান। কেবল জানার নাম ঈমান নয়। ইবলিস শয়তান এ সব বিষয় জানে, কিন্তু না মানার কারণে বেঈমান।এসব বিষয়গুলোকে বিশ্বাস করে যখন আল্লাহর ভয়ে তাঁর আদেশ-নিষেধ মানবে তখনই তাকে ঈমানদার বলা হবে। সে ঈমানদার কিনা তা পরীক্ষার জন্য অদৃশ্য বিশ্বাসের সাথে শারীরীক ইবাদত নামায ও আর্থিক ইবাদত যাকাত ও দান-খয়রাতকে ঈমানের অপরিহার্য বিষয় হিসাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। ঈমান বজায় রাখার জন্য নামায কায়েমের পর যাকাত ও দান খয়রাত করতে হবে। আরেক আয়াতে আল্লাহ্তায়ালা বলেছেন, “তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত কখনও পূণ্য লাভ করতে পারবে না।" ৩ঃ৯২।
নামায, যাকাত ও দান-খয়রাত ঈমানের অংগ হওয়ায় এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামতো নয়ই, ঈমানও পাশ্চাত্যের ভাববাদ নয়। মনের ভক্তিমূলক অনুভূতিকেই তারা ধর্ম বলে। আল্লাহতায়ালার অস্তিত্বে বিশ্বাসকে ভাববাদ বলে- স্রষ্টার স্বরূপ যাই হউক। ঈমান ও ইসলাম দু'টোতেই আল্লাহর নির্দেশিত কর্মবাদ আছে। তেমনি আছে স্রষ্টার প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাস।
পরের আয়াতে অদৃশ্যে বিশ্বাসের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি যা নাযিল হয়েছে অর্থাৎ কোরআনুল করীমের সাকুল্য আয়াত এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের নিকট যে সব কিতাব নাযিল হয়েছে তাতেও বিশ্বাস করা ঈমানের অংগ।
কোরআনে যেসব অদৃশ্যের কথা আছে, তার মধ্যে প্রধানত আছে, আল্লাহতায়ালার নিরাকার অস্তিত্বের কথা। তিনিই একমাত্র সৃষ্টি কর্তা ও উপাস্য, তাঁর কোন শরীক নেই, একমাত্র তিনিই একক অবিভাজ্য সার্বভৌমত্বের অধিকারী বলে ঘোষণা করে তাঁর স্বরূপ, গুণরাজি ও সর্বব্যাপী ক্ষমতার কথা কোরআনে জানিয়েছেন। তাঁর কোন শরীক থাকলে মতানৈক্যের কারণে সৃষ্টিতে বিশৃংখলা দেখাদিয়ে সব ধ্বংস হয়ে যেত।
আল্লাহ্তায়ালা অনাদি, অনন্ত, চিরস্থায়ী। তিনি তাঁর গুণে, নামে ও কাজে প্রসংশিত। তিনি সৃষ্টিকরেন, প্রতিপালন করেন, রিযিক দেন, আবার তিনিই মৃত্যু ঘটান, সমগ্র সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী, কিন্তুতিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তাঁর সমকক্ষ কিছুই নেই। কোরআনে যেখানে আল্লাহ্তায়ালার হাত, মুখ, শরীর এবং আরশে স্থিত হওয়ার কথা আছে, সেগুলি তাঁর গুণ, কোন কিছুর সাথে তাঁর তুলনা বা উপমা হতে পারে না। মানুষের মত তাঁর অংগ নেই- তিনি নিরাকার। আল্লাহতায়ালা বলেন, “যাদের অন্তরে সত্য লংঘনের প্রবণতা রয়েছে শুধু তারাই ফিতনা এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে যা রূপক তার অনুসরণ করে।” (৩ঃ৭)। আল্লাহতায়ালার হাত, পা, মুখ ও আরশে বিরাজমান কোরআনে থাকারকারণে এতে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে, এগুলোকে গুণ বলে জানতে হবে, কিন্তু এর ব্যাখ্যাআল্লাহ্তায়ালাই জানেন।
কোন জিনিস কিভাবে সৃষ্টি করবেন তা প্রথমে লওহে মাহফুযে লিখেছেন, পরে তাঁর আদেশ ও ইচ্ছায় সব কিছু সৃষ্টি হয়েছে।
মানুষ ও জিনকে ঈমান ও কুফর হতে পৃথক রেখে সৃষ্টি করেছেন। নবী-রাসূল মারফত ইবাদত করারএবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার আদেশ-নিষেধ করেছেন। তিনি ভালমন্দ সৃষ্টি করে মন্দ পরিহার করেভাল গ্রহণ করতে আদেশ দিয়েছেন। যারা তাঁর আদেশ অমান্য করে মন্দকে গ্রহণ করবে- পরীক্ষাক্ষেত্রহিসাবে দুনিয়াতে আল্লাহ্ তাদের মন্দ কাজ করতে বাধা দিবেন না। যে সব ভাল ও মন্দ কাজ সংগঠিতহয় তা তার অনুমতি ক্রমেই সংগঠিত হয়। তবে ভাল ও মন্দের পরিণাম ভাল ও মন্দ হবে। তওবাহ্করে মাফ না চাইলে আখিরাতে মন্দ কাজ জাহান্নামে নিয়ে যাবে। ভাল কাজ করলে আল্লাহতায়ালা মদদ দিবেন এবং ভাল আমলের জন্য তাকে জান্নাত নিয়ে যাবেন। আল্লাহতায়ালা অত্যাচারী শাসকদের মত নন যে, কারো উপর জুলুম করবেন। প্রত্যেকের ভাল-মন্দ আমল তাকে জান্নাত ও জাহান্নামে নিয়ে যাবে।
//////////॥॥॥
আখিরাতে বিশ্বাস—
আখিরাতে বিশ্বাস ঈমানের অংগ। দুনিয়াতে আমরা যা করি পরকালে তার কর্মফল পাব। হাশর বাকর্মফল দিবসে মানুষ ও জিনদের দুনিয়ার কার্যাবলীর মূল্যায়ন হয়ে যে যা অর্জন করেছে, সে অনুযায়ীজান্নাত ও জাহান্নামে যাবে। মৃত্যুর পর নেককারদের আত্মা আমলনামাসহ পুনরুত্থান পর্যন্তইল্লিয়্যীনে থাকবে আর পাপীদের আত্ম্য তার আমলনামাসহ সিজ্জীনে থাকবে।
আল্লাহতায়ালা বলেছেন-“অবশ্যই নেককারদের আমলনামা ইল্লিয়্যীনে (৮৩:১৮)
"পাপীদের আমলনামা তো সিজ্জীনে।” (৮৩ঃ৭)
ঈমানদার হতে হলে অবশ্যই আত্মার অমরতা স্বীকার করতে হবে। দুনিয়ার ভাল-মন্দ কার্যাবলীরপুরস্কার ও শাস্তি হাশরে স্থির হবে, তাতে নেককারগণ বেহেশতে ও গুনাহগারগণ দোযখে যাবে এবংকিয়ামতের পর পুনরুত্থানের পূর্বে বরযখে ইল্লিয়্যীনে বা সিজ্জীনে থাকবে-এ কথা বিনা যুক্তি-প্রমাণেবিশ্বাস করে দুনিয়াতে ইবাদত ও জীববৃত্তি চালাতে হবে। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের যুক্তি-প্রমাণ দৃশ্যমান জগতপর্যন্ত-অদৃশ্য জগতে তা অচল, যতক্ষণ না অদৃশ্য জগত তার সামনে উদ্ভাসিত হবে।
এই দুনিয়াতেও অদৃশ্য সত্য তার সামনে উদ্ঘাটিত হতে পারে, যদি সে অদৃশ্য সত্যে বিশ্বাস করেআল্লাহ্ ভিন্ন সমস্ত পদার্থ, চিন্তা-ভাবনা মন থেকে দূর করে দিতে পারে। কি ভাবে এটা সম্ভাবপর তারনিয়ম-পদ্ধতি রাসূল মকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজের জীবন ও বাণীরদ্বারা স্থির করে দিয়ে গেছেন। সেটাই আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছার পদ্ধতি। অদৃশ্যে বিশ্বাস করেঈমান-আকীদা সঠিক করে ইসলামে পরিপূর্ণ দাখিল হয়ে ইসলামের রোকনসমূহ পালন করে আল্লাহ্পর্যন্ত পৌঁছার নিয়ম-কানুন শিক্ষা ও পালনের জন্য তরীকতে দাখিল হতে হয়।
ঈমানের মূলমন্ত্র—
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্” হলো ঈমানের মূলমন্ত্র। এতে আন্তরিক বিশ্বাস এবং মুখও কাজের ভিতর দিয়ে তা প্রকাশ করার নাম ঈমান।
লা ইলাহার দ্বারা সমস্ত উপাস্য যথা-মূর্তি, প্রকৃতি, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নিজ প্রবৃত্তি ইত্যাদি- যেগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও তাগুত সংগঠিত হয়ে ইসলাম বিরোধী ও পরিপন্থী জীবনপদ্ধতি এবং মতবাদ গঠন করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার ও অমান্য করতে হবে। এগুলো ইলাহ নয়বলে জানতে হবে, তেমনি জানতে হবে যে বিভিন্ন উপায় ও জীবন উপকরণও ইলাহ নয়। সমস্তউপায়-উপকরণ ও মানুষের কর্মক্ষমতা আল্লাহ্তায়ালাই সৃষ্টি করেছেন।
উপাস্য হলো, একমাত্র আল্লাহ্তায়ালা। অতঃপর তাঁর বাক্যাবলীর সাহায্যে কোরআনে যা ব্যক্তহয়েছে সেসবে বিশ্বাস এবং কোরআনে ব্যক্ত সব আদেশ- নিষেধ মানার নাম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহতেবিশ্বাস। একমাত্র তিনিই আল্লাহ্তায়ালা, যিনি সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও পালনকর্তা। সার্বভৌমত্ব একমাত্র তাঁরই, তিনিই একমাত্র আইনদাতা। তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন।সব সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী, অথচ তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। ইচ্ছা করলে যে কোন অভাবীর প্রার্থনামঞ্জুর করে অভাব পূরণ করতে পারেন।
এই মহামন্ত্রের শেষাংশ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহতে হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সমগ্র রিসালাত ও সুন্নাহকে ঈমানের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুররাসূলুল্লাহ্-আল্লাহতায়ালা সহ সমগ্র কোরআন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর রিসালাতসহ সমগ্র সুন্নাহতে বিশ্বাস ও মান্য করা বোঝাচ্ছে। কারণ আল্লাহতায়ালাতাঁর বাক্যাবলী হতে পৃথক নন। তেমনি রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)ওসুন্নাহ্ হতে পৃথক নন, নইলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহতে বিশ্বাস ও মান্য করা হলোনা। যদি এ কালেমাতে বিশ্বাস করে এতে অন্য কিছু মিশ্রিত না করে কেউ মৃত্যু মুখে পতিত হয়-তবে সেবেহেশতে যাবে বলে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলে গেছেন। শর্ত হলোকালেমার প্রথম অংশ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহতে যদি শির্ক ও কুফর মিশ্রিত না করে। কোরআনের একটাআয়াত ও অস্বীকার করলে ঈমান থাকবে না।
তাই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনার ফলে কোরআন ও সুন্নাহ্ উপর আল্লাহ্ নির্দেশিতইসলামী জীবন পদ্ধতি গড়ে উঠেছে।
আল্লাহতায়ালা, কোরআন, রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর সুন্নাহ বাজীবন পদ্ধতিকে বিশ্বাস করে যে মানবে সেই ঈমানদার হবে।
কেউ ঈমানের সাথে অন্য কিছু মিশ্রিত করলেই তাঁর ঈমানের উপর জুলুম করা হলো আর ঈমানেরউপর জুলুম করার অর্থ হলো নিজ আত্মার উপর জুলুম করা, কারণ বেহেস্তে যাওয়ার একমাত্র শর্তঈমান। যার ঈমান নেই তাকে আল্লাহ্তায়ালা মাফ করবেন না। ঈমানের সাথে মরলেও যতটুকু অন্যকিছু মিশ্রিত করবে, আখিরাতে হাশরে ও দোষখে ততটুকু শাস্তি ভোগ করবে, যদি আল্লাহ্তায়ালা মাফনা করেন। তাই ঈমানের উপর জুলুম করার অর্থই হল নিজ আত্মার উপর জুলুম। কুফর নিয়ে মরলেআল্লাহতায়ালা মাফ করবেন না বলে ওয়াদাবদ্ধ। কেউ শিরক-কুফর করে ফেললে তখনই তওবাহ্করে ঈমানে প্রত্যাবর্তন করা দরকার।
যে কোন উপাস্যকে মনগড়া আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে সমাজের প্রভাবশালীরা সেই মনগড়া আদর্শকেনিজেদের স্বার্থে কাজে লাগিয়ে আদেশ, নিষেধ বা আইন-কানুন তৈরী করে। অতঃপর আদর্শেরপ্রলেপে জনগোষ্ঠী দ্বারা তা মানাতে ও পালন করাতে পারলে একটা আল্লাহ্ ভিন্ন জীবন পদ্ধতি গঠনকরা যায়। পূর্বকালে বিভিন্ন মূর্তিকে উপাস্য করে ক্ষমতাশালীরা তাদের স্বার্থানুযায়ী অসত্য-বিশ্বাসেরচেতনার উপরে জীবন পদ্ধতি গঠন করতো।
নফস সৃষ্টির সময়েই অবাধ্য ছিল, শাস্তি দিয়ে আল্লাহতায়ালা তাকে বাধ্য করেছিলেন। নফস ঈমানপ্রত্যাখ্যান করে কুফরীর দ্বারা ঈমান ঢেকে দেয়। আকল ও আত্মার স্রষ্টার প্রতি একটা আকর্ষণ থেকেযায়। দ্বিতীয়তঃ মুশরিকরা নিজেদের খুব চালাক বলে মনে করে। তারা মনে করে আল্লাহতায়ালাকেওবিশ্বাস করব নিজের ব্যক্তিস্বার্থের ক্ষতি না করে। যতদূর পারি তাঁর আদেশ-নিষেধ মানবো যাতেআখিরাতে শাস্তি না পাই। আর দুনিয়ার আয়-উন্নতি ও নাম যশের জন্য মানবীয় সার্বভৌমত্বমানবো, যা মূর্তি বা বিভিন্ন মতবাদের প্রলেপে আসে। এতে দুনিয়া এবং আখিরাত দু'টোই পাওয়াযাবে। আদি কাল হতেই অধিকাংশ আদম সন্তান এ মনোভাবের জন্য মুশরিক রূপে নিজেদেরপ্রতিষ্ঠিত করে, এই মুশরিকরাই যখন আল্লাহতায়ালার আইনের অথবা স্রষ্টার আইনের প্রচার ওপ্রতিষ্ঠাকারীদের সক্রিয় বিরোধীতায় লিপ্ত হয়, তখন কাফের বনে যায়। বিনা তওবায় শিরক ও কুফরনিয়ে মৃত্যু হলে আল্লাহ্তায়ালা তাদের মাফ না করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন বলে ওয়াদাবদ্ধ।আল্লাহ্তায়ালার সার্বভৌমত্বের সাথে মানবীয় সার্বভৌমত্ব মানা শিরক, শুধু মানবীয় সার্বভৌমত্বমানা কুফর। এ কথাগুলো এখানে এ কারণে বলা হলো যে, ঈমান নষ্ট করে তাসাওউফ ও তরীকতঅবলম্বন করে কোন ফল হবে না- বরং এ লাইনে কোন অগ্রগতি না দেখে নিরাশ হবে। বর্তমানেচক্রবৃদ্ধি হারে এ বিষয়টা বেড়ে চলেছে যে, অর্থ ও ক্ষমতার লোভে ঈমানের মূলমন্ত্র কালেমাতাইয়্যেবাকে বাদ দিয়ে অনেকে পাশ্চাত্য মুশরিকদের দেওয়া মতবাদের পিছনে ছুটে পেরেশানীর মধ্যেনিক্ষিপ্ত হচ্ছে। আখিরাতের বদলে জাহান্নাম খরিদ করে প্রবৃত্তির খায়েশ পূরণ করছে।ঈমানদারগণের এর থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
আল্লাহতায়ালা এদের সম্পর্কে বলেছেন- “তারা আল্লাহর সমকক্ষ উদ্ভাবন করে, তাঁর পথ হতে বিভ্রান্তকরার জন্য। বলুন, ভোগ করে নাও, পরিণামে অগ্নিই তোমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল।” ৪৪:৩০।
যারা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” এ কালামের সাথে এ জাতীয় জঞ্জাল না মিশিয়েআল্লাহতায়ালা, তাঁর একত্ব ও সার্বভৌমত্ব এবং কোরআন ও সুন্নাহকে মেনে এ কালেমার সাক্ষী দেয়, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ হযরতওবাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন,- “যে কেহ সাক্ষ্য দেয়- আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোনউপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল- আল্লাহ্ তাঁর জন্য দোযখ হারাম করবেন।” মুসলিম।
হযরত জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,- 'দু'টি ঘটনা অবশ্যই ঘটবে। একজন লোক জিজ্ঞেস করলেন- 'সে দু'টিঘটনা কি?' তিনি জওয়াব দিলেন,-“আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট জীব তারাই, যারা কুফরী করে এবং ঈমানআনে না।" ৮:৫৫।
সব কিছুর সার হলো এ কালিমা, আর এ কালিমার সার হলো তওহীদ। অর্থাৎ সব কিছু আল্লাহ্ তা'আলা দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, সব কিছু আল্লাহ্তায়ালার দ্বারা ঘটছে, সব কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে তাঁরএকত্বে বিলীন হচ্ছে বা হবে। যার যা তকদীরে আছে তাই ঘটবে। মানুষসহ প্রাণীজগত, জড়জগতএবং নূরী জগতে যাকে যতটুকু কর্মক্ষম করেছেন, যে ততটুকু কর্মক্ষম হয়েছে। সবার কর্ম ও শক্তিআল্লাহতায়ালার দান। ভাল-মন্দ সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন। সব কিছুর মূলে আল্লাহতায়ালা।সৃষ্টির প্রতি যা যা প্রত্যাদেশ করেছেন সব কিছু সে ভাবেই চলছে। মানুষ ও জিনের প্রতি ওহীপাঠিয়েছেন স্বেচ্ছায় মন্দকে পরিহার করে ভাল গ্রহণ করতে। যে স্বেচ্ছায় প্রত্যাদেশ মেনে চলবেআল্লাহ্ তাকে বেহেশতে সুখ স্বাচ্ছন্দে রাখবেন, যে তাঁর প্রত্যাদেশ বা ওহী অমান্য করবে তাকে দোযখেশাস্তি দেবেন।
অদৃশ্য সত্যে বিশ্বাস তিন প্রকার—
পাক কোরআনে যত অদৃশ্যের কথা বলা হয়েছে, যে গুলো পঞ্চইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুধাবন করা যায় না।যেমন আল্লাহতায়ালা, নবুয়ত-রিসালাত, ওহী, ফিরিস্তা, কিয়ামত, হারাম-হালাল, বেহেশত, দোযখ, জিন ও শয়তান ইত্যাদি। এ সব অদৃশ্য সত্যে বিশ্বাস করার নাম ঈমান।
অদৃশ্য সত্যে বিশ্বাস আবার তিন রকম, যথাঃ (১) ইলমুল ইয়াকীন। (২) আয়নুল ইয়াকীন।(৩)হাক্কুল ইয়াকীন।
ইলমুল ইয়াকীন–
কোরআন, হাদীস ও ফিকাহ্ পড়ে বা কারো থেকে জেনে যে জ্ঞান লাভ হয় তাতে বিশ্বাস করার নামইলমুল ইয়াকীন। বর্তমান কালে অধিকাংশ আলেম সাহেবগণ ইলমুল য়াকীনের সাহায্যেওয়াজ-নসিহত ও ইবাদত করেন।
আয়নুল ইয়াকীন–
ইলমুল য়াকীনের অদৃশ্য সত্যকে দেখা ও শোনার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা বাহ্য পঞ্চ ইন্দ্রিয়েরসমন্বয়কারী যে কলব বা হৃদয় ইন্দ্রিয় দান করেছেন যিকির দ্বারা তা পরিষ্কার করে অন্তরচোখেরসাহায্যে দেখে-শোনে স্রষ্টার প্রতি যে বিশ্বাস অর্জিত হয়। তাকে বলা হয় আয়নুল ইয়াকীন। যাফানাফিল্লাহতে অর্জিত হয়।
হাক্কুল ইয়াকীন–
ইলমুল ইয়াকীন দ্বারা কোরআন, হাদীস ও ফিকাহ্ পড়ে অদৃশ্য সত্যে যে বিশ্বাস জন্মায় আয়নুলইয়াকীন দ্বারা তা দেখে শোনে নূরে ইলাহীতে নিজকে ডুবিয়ে মিশিয়ে ও বিলীন করে অর্থাৎ ফানা হয়েআল্লাহতায়ালার উপর তাঁর জ্ঞান ও গুণের উপর বাকাবিল্লাহতে যে বিশ্বাস জন্মে তাকে বলা হয় হাক্কুলইয়াকীন।
তরীকতে রিয়াযত ও মেহনত ছাড়া ফানাফিল্লাহ ও বাকাবিল্লাহ হাঁসিল না হলে আয়নুল ইয়াকীন ওহাক্কুল ইয়াকীন হাসিল হয় না। হাক্কুল ইয়াকীন দ্বারা ঈমান হাসিল না হলে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'কেপরিপূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না এবং তওহীদ রূহতে পূর্ণভাবে মিশে না, যা বাকাবিল্লাহতে হাসিল হয়।এ কালিমার অপর অংশ "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহতে” নবুয়ত, রিসালাত ও তাঁকে পরিপূর্ণভাবে বুঝতেহলে আল্লাহু জাল্লা শানুহুর মাকামে আদিমত্বের নূরে ফানা-বাকা হতে হয়, যা তাঁর অপরিবর্তনীয়অসীম সত্তা। মাঝ পথে নবুওতের মোকামে নবুয়ত ও রিসালাত বুঝা যায়।
ঈমান হয়ত কারো পার্থিব জীবনের ধনসম্পদ এনে দিবে না, কিন্তু তা দুনিয়াতে চারিত্রিক ও মানসিকশক্তি ও ঐশ্বর্য দান করবে। আখিরাতে লাভ করবে সুখ-শান্তিময় বেহেশত। সংক্ষিপ্ত দুনিয়ার জীবনেআল্লাহ্ তা'আলার জন্য বান্দার ত্যাগ-তিতীক্ষার বদলে দুনিয়াতে সে জানতে পারবে দৃশ্যমান জড়জগত, অদৃশ্য নূরী, রূহী ও স্রষ্টার স্বরূপ, কার্যাবলী এবং মানব জীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কে এক অখন্ড ওসামগ্রিক জ্ঞান। মানব জীবনের স্বরূপ, সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কারণসমূহ, সত্য, মঙ্গল ও আদর্শকেউপলব্ধি করতে পারবে। যার ফলে অখন্ড মানব জীবনের সমস্যা, তার কারণ এবং জীবনের প্রয়োজনজানতে পারবে। ফলে সত্য ও আদর্শের উপর অমর জীবন সংগঠিত করতে পারবে। পূর্ণ ঈমাণেরসাহায্যে যেমন আপন সত্তা ও সৃষ্টি রহস্য জানতে পারবে, তেমনি আত্মার অনাবিল আনন্দ ও ঐশীক্ষমতার কিছু স্বাদও উপলব্ধি করতে পারবে। ফলে বান্দার অস্তিত্বের সত্তাসার আত্মাকে শক্তিশালী ওসৌন্দর্য্যমন্ডিত করতে পারবে।
অনেকে ঈমান আনে, কিন্তু দুনিয়ার লোভ-লালসায় আক্রান্ত হয়ে স্রষ্টার নিষিদ্ধ কাজ করে ঈমানকেকুলষিত করে এবং কলুষিত ঈমান মুতাবিক সৎ কাজ না করে পাপে লিপ্ত হয়। আল্লাহতায়ালা মাফনা করলে শিরক ও কুফর ছাড়া সেই কুলুষিত ঈমান নিয়ে মরলে দোষখে যাবে। অবশেষে শাফায়াতেরমাধ্যমে মুক্তি পাবে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, "যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদের জন্য, তারা সৎপথ প্রাপ্ত।" (৬ঃ৮২)
যারা ঈমান এনেও শিরক ও কুফরী করবে এবং বিনা তওবায় মারা যাবে, তারা চিরকাল জাহান্নামেথাকবে, এদের কোন নিরাপত্তা নেই। ঈমান এনে তা পাপ দ্বারা নষ্ট করতে নেই, আর শিরক ও কুফরীকরে তা ধ্বংসও করতে নেই।
"যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহ্ যিকিরে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়, জেনে রাখ আল্লাহ্ যিকিরেই চিত্তপ্রশান্ত হয়। যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে কল্যাণ ও শুভ পরিনাম তাদেরজন্যই।" (১৩:২৯)
যিকির দ্বারা ফানাফিল্লাহ্ ও বাকাবিল্লাহ্ অর্জন ছাড়া আয়নুল ইয়াকীন ও হাক্কুল ইয়াকীন হাসিল করাযায় না, আবার তরীকত ও তাসাওউফ ছাড়া ফানাফিল্লাহ্ ও বাকাবিল্লাহ হাসিল হয় না। শুধু ইলমুলইয়াকীন ঈমান পরিপূর্ণ হয় না, যদি হতো তবে আল্লাহতায়ালা পাক কোরআনে আয়নুল ইয়াকীন ওহাক্কুল য়াকীনের কথা বলতেন না।
আয়নুল ইয়াকীন ও হাক্কুল ইয়াকীনের জন্য তাসাওউফ ও তরীকত অপরিহার্য। যারা তাসাওউফ বাতরীকতের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেন, তারা প্রকারান্তরে আয়নুল ইয়াকীন ও হাক্কুল ইয়াকীন হাসিলথেকে লোকদের সরিয়ে রাখতে চান। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হাদীসেজিবরাঈল বা উম্মুল হাদীসে যে ইহসান সম্মন্ধে বলেছেন, সেই ইহসানও তরীকত ছাড়া অর্জন করাযায় না। সেই ইহসান হাঁসিল করার জন্য আমাদের তাসাওউফ ও তরীকত অনুযায়ী সাধনা করতেহবে। শুধু ইলমুল ইয়াকীন দ্বারা ইখলাসের সাথে ঈমান অর্জিত হয় না। ইলমুল ইয়াকীনে সঠিকভাবেনিষ্ঠা সহকারে বন্দেগী করা সম্ভব হয় না বলে রিয়ার কারণে ফাসেকে পরিণত হওয়ার আশংকা থেকেযায়।
ঈমানসহ পাঁচ রোকন আদায়, যিকির ও সৎকর্ম সৌভাগ্যের চাবিকাঠি।
"যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে এবং মুহাম্মদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস করেআর উহাই তাদের প্রতিপালক হতে প্রেরিত সত্য, তিনি তাদের মন্দ কাজগুলো ক্ষমা করবেন এবংতাদের অবস্থা ভাল করবেন।” (৪৭ঃ২)
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন
"যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে না, আমি সেসব কাফিরদের জন্য জলন্ত অগ্নিপ্রস্তুতরেখেছি।” (৪৮:১৩)
-----
003
ইসলাম—
ঈমান ও ইসলামে কিছুটা পার্থক্য আছে। ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস আর ইসলাম হলো সেই বিশ্বাসঅনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করা। ঈমান ছাড়া ইসলাম হয় না, আবার ইসলাম ছাড়া ঈমান নেই। ঈমানযত গভীর হয় ইসলামে নিষ্ঠা তত প্রবল হয়, ঈমান যত হালকা হয় ইসলাম অনুসরণে তত শৈথিল্যআসে, ফলে প্রবৃত্তি প্রবল হয়ে পাপে লিপ্ত হয়।
আল্লাহর রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইসলাম, ঈমান ও ইহসানের সংজ্ঞাদিয়ে গেছেন।
হযরত ওমর ফারুক (রা.) হতে বর্ণিত আছে, "একদিন আমরা আল্লাহর রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট বসা ছিলাম। তখন হঠাৎ একজন লোক আমাদের নিকট এল,তার সাদা পোশাক ছিল, ঘোর কৃষ্ণ বর্ণ কেশরাজি ছিল, পথ ভ্রমণের ক্লেশ তার দেহে ছিল না, আমাদের মধ্যে কেউ তাকে চিনল না। সে হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)কেএসে সালাম করল। তারপর জানুদ্বয় হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এরজানুদ্বয়ের নিকটবর্তী করে তাঁর হস্তদ্বয় তাঁর জানুদ্বয়ের উপর রেখে জিজ্ঞেস করল-'হে মুহাম্মদ।ইসলাম কি? আমাকে বলুন।'
তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ইসলাম এই যে, আল্লাহ্ ব্যতীত উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল- এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের রোযা রাখা, পথ খরচের শক্তি-সামর্থ্য থাকলে কা'বা শরীফের হজ্ব করা। লোকটা বললঃআপনি সত্য বলেছেন। এ প্রশ্নে ও সত্য সমর্থনে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
আবার লোকটা প্রশ্ন করল, ঈমান কি? তা আমাকে বলুন। তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহকে, তাঁর ফিরিশতাগণকে, তাঁর ধর্মগ্রন্থসমূহকে, তাঁর রাসূলগণকে এবংতকদীরের ভাল মন্দে বিশ্বাস করা।
সে বললঃ আপনি ঠিক বলেছেন। সে আবার জিজ্ঞেস করলঃ ইহসান কি? তা আমাকে বলুন।
হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তা এই যে, এরূপভাবে আল্লাহ্ ইবাদতকরা যেন তুমি তাঁকে দেখছ এবং তাঁকে না দেখলেও তিনি তোমাকে দেখছেন।” (বুখারী ও মুসলিম)।
এ হাদীসের প্রশ্নকারী জিবরাঈল (আ.) ছিলেন বলে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উল্লেখ করে গেছেন। পূর্ণ হাদীসটিতে কিয়ামতের কথাও সত্য বলে উল্লেখ আছে। একেকেউ কেউ হাদীসে জিবরীল বলে থাকেন। সূরা ফাতেহাকে যেমন উম্মুল কোরআন বলা হয়, এহাদীসটিকেও উম্মুল হাদীস বা হাদীসের মা বলা হয়।
---